রবিবার ● ৪ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » মুক্তমত » ফরাসি বিজ্ঞানী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী লুই ব্রেইলের বিশেষ অবদান
ফরাসি বিজ্ঞানী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী লুই ব্রেইলের বিশেষ অবদান
মো. মোশাররফ হোসেন মজুমদার
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের আলোর পথের দিশারি মহান লুই ব্রেইল একজন ফরাসি আবিষ্কারক ও পূজনীয় শিক্ষক এবং বিজ্ঞানী। আধুনিক সভ্যতায় শিক্ষা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই, যা অর্জন করার জন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্রেইল পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে সফলভাবে সম্ভবপর হয়েছে। লুই ব্রেইল তার জীবনে ১৫ বছর বয়সে এ ব্রেইল পদ্ধতির প্রাথমিক সংস্করণ অর্থাৎ ছয় বিন্দুকে বিভিন্ন নকশায় ব্যবহারের কৌশল প্রবর্তন করেন, যা ১৮২৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায়। পরবর্তীতে ১৮৩৭ সালে তিনি ব্রেইল পদ্ধতির আরও উন্নত সংস্করণ ব্যবহার শুরু করেন।
তিনি ১৮০৯ সালের ৪ জানুয়ারি ফ্রান্সের কুপভ্রে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভীষণ শিক্ষানুরাগী একজন ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন, তিন বছর বয়সে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার পর ২০ বছর বয়সে তিনি অন্যান্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা দিতে অগ্রসর হন। এরপর এক বছরের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা ও কল্যাণার্থে তিনি ব্রেইল পদ্ধতি আবিষ্কারের মাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করেন। দৃষ্টি নিবদ্ধ হওয়া ছাড়াই এক থেকে ছয়টি বিন্দুতে অঙ্গুলি নির্দেশনা ও স্পর্শের মাধ্যমে বিশ্বের লাখ লাখ অন্ধ ব্যক্তি শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ-পূর্বক তাদের লেখনী কিংবা পড়ার কাজ সম্পন্নপূর্বক যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পাদন করে থাকেন। বর্তমানে এ পদ্ধতিটি বিশ্বের সর্বত্র পরিচিতি পেয়েছে ও প্রচলিত বল ভাষায় গ্রহণ করা হয়েছে।
শিক্ষা ও কর্মজীবন
লুই ব্রেইলের বাবা ছিলেন একজন চামড়া ব্যবসায়ী। চার সন্তানের মধ্যে লুই ব্রেইল ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তিন বছর বয়সে একদিন আকস্মিকভাবে লুই ব্রেইলের এক চোখে সুইয়ের গুঁতো লেগে যায় এবং তিনি একটি চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন। ওই সময় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রচলন না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত চোখ সংক্রমিত হয়। এটি বিস্তৃত হয়ে অপর চোখকেও আক্রান্ত করে। ফলে পাঁচ বছর বয়সে তিনি দুচোখের দৃষ্টি হারিয়ে চিরকালের জন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে যান। ১০ বছর বয়সে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের উপযোগী রাজকীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ব্রেইল মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। বিজ্ঞান এবং সংগীতে তার দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। যখন ব্রেইল তার পড়াশোনা শেষ করেন, তখন তাকে শিক্ষকের সহকারী হিসেবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২৪ বছর বয়সে তিনি অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ব্রেইল জীবনের বেশির ভাগ সময় ইতিহাস, জ্যামিতি এবং বীজগণিত অধ্যয়ন ও শিক্ষা দিয়ে কাটিয়েছেন।
১৮৩৪ থেকে ১৮৩৯ সাল পর্যন্ত প্যারিসের সেন্ট-নিকোলাস-দেস-চ্যাম্প চার্চের গির্জায় এবং পরবর্তীতে সেন্ট ভিন, সেন্ট দে পল চার্চের অর্গানিস্ট ছিলেন তিনি। ব্রেইলকে সারা ফ্রান্সের বিভিন্ন গির্জার অর্গানিস্ট হিসেবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
ব্রেইল পদ্ধতির আবিষ্কার
লুই ব্রেইল ছিলেন সেই প্রদীপ। যার হাত ধরেই আজ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ শিক্ষার আলো দেখতে পেয়েছেন। তিনি জানতেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা। যা সম্ভব ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে। ব্রেইল কিন্তু কোনো ভাষা নয়। এটি একটি লিখন পদ্ধতি। চার্লস বারবিয়ার কর্তৃক উদ্ভাধিত যুদ্ধকালীন সময় রাতে পড়ার জন্য যে উত্তল অক্ষরের প্রচলন ছিল তা পর্যবেক্ষণ করে লুই ব্রেইল কাগজে উত্তল বিন্দু ফুটিয়ে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যার নাম দেওয়া হয় ব্রেইল পদ্ধতি। ব্রেইল নামটির সঙ্গে সবাই কমবেশি পরিচিত। বর্তমানে ব্রেইল পদ্ধতি ব্যবহার করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষকে শিক্ষা দেওয়া হয়। আর এ উপায়ে অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
শিক্ষার আলো থেকে যেন কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ বঞ্চিত না হয়, তাই নিজে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি হয়েও অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আবিষ্কার করেন ব্রেইল পদ্ধতি।
ব্রেইল মাত্র ১৫ বছর বয়সে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বর্ণমালা তৈরি করেন। এটি ছিল তার স্বপ্ন। পাঁচ বছর পর ১৮২৯ সালে ব্রেইল পদ্ধতি প্রকাশ পায়। বিভিন্ন জ্যামিতিক প্রতীক এবং বাদ্যযন্ত্রের চিহ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল এ বর্ণমালায়।
ব্রেইল পদ্ধতিতে মূলত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা লিখতে ও পড়তে পারে। এটি এক থেকে ছয়টি ডটের মাধ্যমেই সব বর্ণ, সংখ্যা ইত্যাদি প্রকাশের একটি মাধ্যম। এই এক থেকে ছয়টি বিন্দু স্পর্শ করেই বর্তমানে বিশ্বের লাখ লাখ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি শিক্ষা গ্রহণ করছেন।
পরলোকগমন
১৮৫৩ সালে ৬ জানুয়ারি মাত্র ৪৩ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহামানব মৃত্যুবরণ করেন। লুই ব্রেইলের মৃত্যুর পর ও প্রতি বছর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন-পূর্বক তার জন্মদিবস পালন করে আসছে। পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর তার জন্মদিনের দিন ৪ জানুয়ারিকে বিশ্ব ব্রেইল দিবস পালন করা হয়। ব্রেইল পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলাই ব্রেইল দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য।
তার এ আবিষ্কারের কারণেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আজ সারা বিশ্বে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছেন। এটি আবিষ্কারের পর তাৎক্ষণিকভাবে লুই-এর গ্রহণযোগ্যতা পাননি। কারণ হাউইয় ইনস্টিটিউটে ব্রেইল পদ্ধতি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি। হাউইয়ের উত্তরাধীকারীরা এ বিরাট আবিষ্কারের বিপক্ষে ছিলেন। এমনকি ইতিহাস বই ব্রেইল পদ্ধতিতে অনুবাদ করার জন্য প্রধান শিক্ষক ড. আলেকজান্ডার ফ্রাংকরেন পেইনিয়ারকে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ বরখাস্ত করেন। লুই ব্রেইলের অকালমৃত্যর দুই বছর পর ওই ইনস্টিটিউটের ছাত্রদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে লুই ব্রেইলের আবিষ্কৃত ব্রেইল বর্ণমালার পদ্ধতি কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে বাধ্য হন। পরে এটি ফরাসি ভাষাভাষীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এখন সারা বিশ্বে প্রচলিত সব ভাষায় ব্রেইল পদ্ধতির লিখন ও পঠন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে সারা বিশ্বের কয়েক কোটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি এ পদ্ধতির কল্যাণে শিক্ষা গ্রহণের অবাধ সুযোগ পাচ্ছে। এমনকি উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে সহজেই এ ব্রেইল পদ্ধতি কাজে আসছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমেরিকান মহীয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী হেলেন কিলার এই ব্রেইল পদ্ধতি অনুসরণ করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক, লেখক ও সমাজসেবক রূপে আত্ম-প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ওই মহীয়সী নারী সারা পৃথিবীতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নকল্পে ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষাদান ব্যবস্থা প্রসার ও প্রচার অভিযান স্বার্থকভাবে কার্যকর করেছিলেন, যার দরুণ ব্রেইল পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকে ধাপিত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষাদানের জন্য প্রাইভেট স্কুল চালু হয় এবং পর্যায়ক্রমে সরকার এ উদ্যোগকে সমর্থনপূর্বক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সরকারি অন্ধ বিদ্যালয় নামে বিভিন্ন বিভাগে বিশেষ স্কুল প্রতিষ্ঠা করে।
ব্রেইল পদ্ধতি লেখার জন্য প্রাথমিকভাবে স্লেট এবং স্টাইলাসের ব্যবহার প্রচলিত ছিল এবং এখনো আছে। এ ছাড়া এ পদ্ধতির আধুনিকায়নের ফলে এখন পোর্টেবল ব্রেইলন নোটেকার, কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্রেইল টাইপ রাইটার, ব্রেইলার নামেও এক ধরনের টাইপ মেশিন, ব্রেইল প্রিন্টার ও ব্রেইল প্রেস ইত্যাদি উন্নতমানের যন্ত্র বর্তমানে ব্রেইল পুস্তক প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার হচ্ছে। এই মেশিনগুলোতে লেখার জন্য শক্ত ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়, যাতে স্ফটিত অক্ষরগুলো সহজে মুছে না যায়। সাধারণত ১৪০-১৬০জিএসএম-এর কাগজ এ কাজে ব্যবহৃত হয়। ব্রেইল ব্যবহারকারীরা অনেকে আধুনিক রিফ্রেসেবল ব্রেইল ডিসপ্লে ব্যবহার করে থাকেন। এর মাধ্যমে কম্পিউটারের মনিটর ও মোবাইলসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক সমর্থনযোগ্য ডিভাইসে তারা পড়তে পারে। বর্তমান বিশ্বে উন্নতমানের ব্রেইল পদ্ধতির সংস্করণ মূলত লুই ব্রেইলের এ বৈজ্ঞানিক বেইল পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রতিফলন। তাই সারা বিশ্বের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরশীল জীবন যাপনের জন্য চিরঋণী। সেহেতু আজ তার এ জন্মদিনে আমরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সমাজ ও সারা দেশের মানুষ লুই ব্রেইলের অবিস্মরণীয় ব্রেইল পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য ও তার কৃতিত্বময় অমূল্য অবদানের জন্য তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ও তার বিদেহী আত্মার কল্যাণ কামনা করছি।
লেখক: সিনিয়র অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বিষয়: #ফরাসি বিজ্ঞানী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী লুই ব্রেইলের বিশেষ অবদা





তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: প্রত্যাশা, দায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা
সাম্প্রদায়িকতার পুনরুত্থান, নির্বাচন-পূর্ব বাংলাদেশের বাস্তবতা
৮ কুকুরছানা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত নারী কী শাস্তি পাবেন?
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, বাংলাদেশের রাজনীতির সন্ধিক্ষণ!
শেখ হাসিনার পতন! কেন?
সংসদীয় রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব
বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ও বীমা খাত একই সূত্রে গাঁথা
তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় ও বিপনণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা খুব জরুরি 
