শিরোনাম:
ঢাকা, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২
Swadeshvumi
বৃহস্পতিবার ● ৮ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » কলাম » নির্বাচনে ক্রাউড ফান্ডিং: সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও ইসির করণীয়
প্রচ্ছদ » কলাম » নির্বাচনে ক্রাউড ফান্ডিং: সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও ইসির করণীয়
৫৮ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ৮ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

নির্বাচনে ক্রাউড ফান্ডিং: সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও ইসির করণীয়

---

শায়লা শবনম 

নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়, অর্থের উৎস এবং স্বচ্ছতার প্রশ্ন প্রায়শই সেই লক্ষ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ক্রাউড ফান্ডিং— একটি নতুন এবং তুলনামূলকভাবে অপ্রচলিত ধারণা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নির্বাচনি ব্যয়ের অর্থ সংগ্রহের এই ধারা এখন রাজনৈতিক জগতে আলোড়ন তৈরি করেছে।

সর্বাধিক নজর পড়েছে দুই প্রার্থীর উপর— তাদের একজন বরিশাল-৩ আসনের ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, অপরজন ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা। ব্যারিস্টার ফুয়াদ অনলাইনে বিকাশ, নগদ ও ব্যাংক হিসাব নম্বর প্রকাশ করে সহায়তা চেয়েছেন। মাত্র ২৫ ঘণ্টায় তিনি প্রায় ২২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে তাসনিম জারা মনোনয়নপত্রে উল্লেখ করেছেন, তার নির্বাচনি ব্যয়ের উৎস প্রাপ্ত ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ক্রাউড ফান্ডিং, যা তিনি ভোটে ব্যয় করবেন। তবে ভোটার তালিকার অনির্দিষ্টতার কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। এ ঘটনা একদিকে দেখায় সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতার নতুন দিগন্ত, অন্যদিকে প্রশ্ন তুলে— নিয়ন্ত্রণ, হিসাবরক্ষণ এবং আইনি কাঠামোর সীমা কতটুকু কার্যকর?

ক্রাউড ফান্ডিং: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

বিশ্বের কিছু দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপে ক্রাউড ফান্ডিং নির্বাচনের স্বাভাবিক একটি অংশ। বাংলাদেশে এই ধারা নতুন। প্রার্থীর পক্ষে এটি মানে সরাসরি জনগণের সঙ্গে সংযোগ ও জনমত যাচাই। তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে— স্বচ্ছতা না থাকলে অর্থের উৎস অজানা থাকে, স্বচ্ছতা না থাকলে ক্ষমতার অসাম্য তৈরি হয়।

আইনি কাঠামো কিছুটা সমর্থন দিয়েছে। নির্বাচনের সংশোধিত আচরণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীকে নির্বাচনি ব্যয়ের সম্ভাব্য উৎস জানাতে হবে। প্রার্থী দেখাতে পারেন— নিজস্ব অর্থ, আত্মীয়-স্বজনের দান, অন্য ব্যক্তির দান বা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থ। আইন সরাসরি ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ শব্দটি উল্লেখ না করলেও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অনুদান গ্রহণের সুযোগ রেখেছে। এতে প্রার্থীর জন্য সুবিধা হলো গোপন চাঁদা ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ সংগ্রহের বিকল্প, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ হলো ব্যয়ের সীমা ও হিসাবরক্ষণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

নির্বাচনি ব্যয়সীমা: আইনি বাস্তবতা

সংশোধিত আইন অনুযায়ী একজন প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে দুটি ভিত্তিতে— সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। অথবা ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হারে হিসাব করা অর্থ, যার মধ্যে যেটি কম, সেটিই চূড়ান্ত ব্যয়সীমা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়— কোনো আসনে ভোটার সংখ্যা যদি ৩ লাখ, তাহলে ১০ টাকা হারে হিসাব করলে ৩০ লাখ টাকা হবে। কিন্তু আইনের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ লাখ টাকা হওয়ায় প্রার্থী সর্বাধিক ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। আবার কোনো আসনে ভোটার সংখ্যা যদি ২ লাখ, তাহলে ব্যয়সীমা দাঁড়ায় ২০ লাখ টাকায়।

এ হিসাবের মধ্যে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের অর্থের ব্যবহার করলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। কমিশনের দৃষ্টি থাকবে মূলত— ব্যয়ের উৎস কি আইনসম্মত, সীমা অতিক্রম হচ্ছে কি না এবং যথাযথ ডকুমেন্টেশন আছে কি না।

ইসির দায়িত্ব ও মনিটরিং

নির্বাচন কমিশন ক্রাউড ফান্ডিংকে আইনি বাধা হিসেবে দেখছে না, তবে ব্যয়ের হিসাব, উৎস ও স্বচ্ছতার দিকে কড়া নজর রাখছে। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “ক্রাউড ফান্ডিং এবারের নির্বাচনে নতুন প্রবণতা। কেউ যদি স্বেচ্ছায় অর্থ প্রদান করে এবং প্রার্থী গ্রহণ করে, এতে ইসির করার কিছু নেই। তবে প্রার্থীর মূল দায়িত্ব— ব্যয়ের হিসাব সঠিকভাবে দেখানো।” এর অর্থ হলো, কমিশন সরাসরি ক্রাউড ফান্ডিং নিষিদ্ধ করবে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রার্থীকে ব্যয়ের হিসাব অডিট ও যাচাইযোগ্য রাখতে হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলদের অনুদান সীমাও আইনের আওতায়। নিবন্ধিত দল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অনুদান নিতে পারবে।

নতুন প্রবণতা, পুরোনো প্রশ্ন

ক্রাউড ফান্ডিং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে—জনসাধারণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ প্রচারণা, এবং সম্ভাব্য বিনিময়হীন অর্থ সংগ্রহ। তবে কিছু প্রশ্নও উঠেছে। এভাবে সংগৃহীত অর্থের নিয়ন্ত্রণ কোথায়, হিসাবরক্ষণ কেমন হবে, এবং কীভাবে আইন লঙ্ঘন রোধ করা সম্ভব হবে?

ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বলেন, ‘অনলাইনে এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ বাংলাদেশের নির্বাচনে নতুন। এটা স্বচ্ছভাবে করতে হলে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে হবে, সমস্ত লেনদেন নথিভুক্ত হতে হবে।’ যদি প্রার্থী এবং নির্বাচন কমিশন যথাযথ মনিটরিং নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ক্রাউড ফান্ডিং হতে পারে ভোটার অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতার শক্তিশালী হাতিয়ার। অন্যথায়, এটি নির্বাচনি অর্থের অপব্যবহার ও বৈষম্য বৃদ্ধি করতে পারে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রচলিত চ্যানেলগুলো— দলীয় চাঁদা, ব্যক্তিগত সহায়তা, আত্মীয়স্বজনের অর্থ যেগুলো সবসময় নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ক্রাউড ফান্ডিং এই চক্রে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ নিয়ে এসেছে। জনমত যাচাই, জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রচারণার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে।

কিন্তু সমালোচকরা বলেছেন, এটি সহজেই আইনি ফাঁক হয়ে উঠতে পারে। কারণ যারা অর্থপ্রবাহের রেকর্ড রাখে না, তারা সীমা অতিক্রম বা অনিয়ম করতে পারে। কমিশনের কার্যকর তদারকি ছাড়া, ক্রাউড ফান্ডিং নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার সমন্বয়

ক্রাউড ফান্ডিং এখন নির্বাচনে নতুন প্রবণতা। এটি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে ভোটার অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে, প্রচারণার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে এবং প্রার্থীর জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রতিটি লেনদেন স্বচ্ছ, ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এবং অডিটযোগ্য হতে হবে। নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলদের যৌথ দায়িত্ব হলো— ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ব্যয়ের হিসাব রেকর্ড রাখা, উৎসের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সর্বোচ্চ ব্যয়সীমার মধ্যে থাকা এবং ভোটারদের বিশ্বাস জোরদার করা।

ক্রাউড ফান্ডিং ভবিষ্যতে একটি নিয়ন্ত্রিত ও গ্রহণযোগ্য পথ হয়ে উঠবে কিনা তা নির্ভর করবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, তদারকি এবং কমিশনের কঠোরতা অনুযায়ী। এ বিষয়টি নির্বাচন-পরবর্তী হিসাব, অডিট ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে। এবারের নির্বাচনই হবে এক দৃষ্টান্ত— নতুন প্রযুক্তি ও সামাজিক অংশগ্রহণের সংমিশ্রণে বাংলাদেশের নির্বাচনে স্বচ্ছতার মানদণ্ড ঠিক কতদূর উন্নত হয়েছে, তা বোঝার সুযোগ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক






আর্কাইভ