রবিবার ● ১১ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » সীমানা পুনর্বিন্যাস: আদালত বনাম ইসি
সীমানা পুনর্বিন্যাস: আদালত বনাম ইসি

শায়লা শবনম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই স্থগিতাদেশের ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপাতত ভোট হবে ৩০০টির মধ্যে ২৯৮টি আসনে। এই ঘটনা বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে বিরল, কারণ তফসিল ঘোষণার পর কোন নির্দিষ্ট আসনে ভোট স্থগিত হওয়ার নজির আগে দেখা যায়নি।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখা থেকে পাঠানো এক লিখিত নির্দেশনায় পাবনা জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসককে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সংসদীয় এলাকা ৬৮ (পাবনা-১) ও ৬৯ (পাবনা-২)-এর সীমানা সংক্রান্ত মামলায় আপিল বিভাগের ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের আদেশ পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত থাকবে। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহেদ মোস্তফা জানিয়েছেন, শিগগিরই বিষয়টি নিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।
সীমানা পুনর্বিন্যাসের সূত্রপাত ও পাবনার বিরোধ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে, গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ নির্বাচনের তফসিলের আগে নির্বাচন কমিশন দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করে। গেজেট অনুযায়ী, পাবনা-১ আসনে পুরো সাঁথিয়া উপজেলা এবং পাবনা-২ আসনে সুজানগর ও বেড়া উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
স্থানীয়ভাবে এই পুনর্বিন্যাসে বিরোধ দেখা দেয়। বেড়া উপজেলার জহিরুল ইসলাম এবং সাঁথিয়া উপজেলার আবু সাঈদ পৃথক দুটি রিট আবেদনের মাধ্যমে হাই কোর্টে গেজেটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন। প্রাথমিক শুনানির পর, ১৭ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট রুল জারি করে এবং ১৮ ডিসেম্বর রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন।
হাইকোর্ট রায়ে বলা হয়, পাবনা-১ আসন থেকে বেড়া উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বাদ দিয়ে পাবনা-২ আসনে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’। আদালত পূর্বের সীমানা পুনর্বহাল করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশোধিত গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেন।
সংশোধিত গেজেট ও আপিল বিভাগ
হাই কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে। এতে পাবনা-১ আসনে পুরো সাঁথিয়া উপজেলা ও বেড়া পৌরসভাসহ চারটি ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অপরদিকে, বেড়া উপজেলার বাকি পাঁচটি ইউনিয়ন ও পুরো সুজানগর উপজেলা নিয়ে পুনর্গঠিত হয় পাবনা-২ আসন।
তবে, এই রায় ও সংশোধিত গেজেটের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে জামায়াতে ইসলামীর পাবনা-১ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং নির্বাচন কমিশন আলাদা ভাবে আপিল বিভাগে আবেদন করেন। শুনানি শেষে ৫ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সংশোধিত গেজেটের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। আদালত জানায়, লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই আদেশ বহাল থাকবে। ফলে কোন গেজেট কার্যকর হবে— এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই অবস্থায় আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত পাবনা-১ ও ২ আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব
ইসি সূত্র জানায়, বাকি ২৯৮টি আসনে নির্বাচনী কার্যক্রম নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলবে। তবে পাবনার দুই আসনে ভোট স্থগিত হওয়ায় নির্বাচনের ফলাফল ও প্রার্থীর মনোনয়ন কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ঘটনা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে এসেছে।
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বলেন, “তফসিল ঘোষণার পর নির্দিষ্ট কোনো আসনে ভোট স্থগিত হওয়ার নজির আমার স্মৃতিতে নেই। অতীতে ভোট স্থগিতের কারণ সাধারণত রাজনৈতিক বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রার্থীর মৃত্যু বা কমিশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো ঘটনার কারণে হয়েছে, আসনের সীমানা জটিলতার কারণে নয়।”
আসন পুনর্বিন্যাসের সংখ্যা ও মামলার পরিসংখ্যান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ৪৬টির সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়। পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত প্রায় ১,৫০০টি আপত্তি ও দাবি কমিশনের কাছে জমা পড়ে। এসব পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।
পুনর্বিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৮টি রিট মামলা দায়ের হয়। তবে পাবনা-১ ও ২ আসনের মামলাগুলো সবচেয়ে জটিল হয়ে ওঠে, কারণ আপিল বিভাগ সরাসরি সংশোধিত গেজেটের ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। অন্যান্য মামলায় আদালত ভোটগ্রহণে বাধা দেয়নি।
ভোট স্থগিতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের সময় কোনো আসনে ভোট স্থগিত হওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। বিগত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন (২০২৬): প্রথমবারের মতো আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলায় ২টি আসনে ভোট স্থগিত।
দশম সংসদ নির্বাচন (২০১৪): রাজনৈতিক বর্জনের কারণে ১৫৩টি আসনে ভোট হয়নি, তবে তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত হয়নি।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬): কয়েকটি আসনে ফলাফল অসম্পূর্ণ বা আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়েছিল, যা আসন পুনর্বিন্যাসজনিত ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাবনার ঘটনা ভবিষ্যতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া, আসন পুনর্বিন্যাস ও তফসিল ঘোষণা প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইসির ভবিষ্যত পরিকল্পনা
পাবনার দুই আসনের নির্বাচনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ইসি আপিলের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন পুনর্বিন্যাসের সময় ভোটার সংখ্যা, প্রশাসনিক সুবিধা, ভৌগলিক অখণ্ডতা ও ২০২২ সালের আদমশুমারি বিবেচনা করে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এসব কারণে ভবিষ্যতে ভোটারের সংখ্যা অনুযায়ী অন্যান্য জেলার আসন সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস করা হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই জটিলতা কমিশনের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে, যাতে তফসিল ঘোষণার আগে সব ধরনের আইনি ঝুঁকি কমানো যায়।
পাবনা-১ ও ২ আসনের ভোট স্থগিতের ঘটনা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনন্য নজির। এর ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত হচ্ছে। আপিল বিভাগের চূড়ান্ত নির্দেশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ভোটার ও নির্বাচন কমিশন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে আসন পুনর্বিন্যাস ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক





বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ
প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব দেওয়ার শেষ দিন ১৫ মার্চ
পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে ভোট
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেলেন যারা
সকালে না, দুপুরে হ্যাঁ: শপথ গ্রহণ নিয়ে জামায়াত-এনসিপির নাটকীয়তা
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ মঙ্গলবার বিকেলে
২৯৭ আসনের গেজেট প্রকাশ
বাংলাদেশ তার ক্যাপ্টেনকে বেছে নিয়েছে: ফাহাদ করিম
২৯৭ আসনে ভোটের হার ৫৯ শতাংশ: ইসি সচিব
দুই দশক রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি 
