শিরোনাম:
ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২
Swadeshvumi
বৃহস্পতিবার ● ২৬ মার্চ ২০২৬
প্রচ্ছদ » গণমাধ্যম » ‘যৌন নিপীড়ন’ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন জরুরি
প্রচ্ছদ » গণমাধ্যম » ‘যৌন নিপীড়ন’ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন জরুরি
১৬ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ২৬ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

‘যৌন নিপীড়ন’ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন জরুরি

গণমাধ্যমের জন্য রেসপন্স প্রোটোকল প্রকাশ

---

নিজস্ব প্রতিবেদক

যৌন নিপীড়ন বর্তমানে সামাজিক ব্যাধি-  এমন মন্তব্য করেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। ফলে ভয়ানক এই ব্যাধি প্রতিরোধে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদারের পাশাপাশি জেন্ডার-ফ্রেন্ডলি গণমাধ্যমকে স্বীকৃতি দেওয়ারও পরামর্শ তাদের। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা বা ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট রেসপন্স প্রোটোকল’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে তারা এসব কথা বলেন।

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন বাংলাদেশ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের জন্য তৈরি নীতিমালাটি (প্রোটোকল) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। আয়োজকরা জানান, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ফরইন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও)-এর সহায়তায় পরিচালিত নারী সাংবাদিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় এটি প্রণয়ন করা হয়।

আলোচনায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেন, সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কার্যকর জবাবদিহিতা ও বাস্তব প্রয়োগ ছাড়া কোনো নীতিমালাই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘যৌন নিপীড়ন এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রোটোকলটি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রতিটি সংবাদকক্ষে এ নিয়ে আলোচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মালিক-সম্পাদকসহ সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন পুরুষ সাংবাদিকরাও অনেক সময় হয়রানির শিকার হন। ফলে এই উদ্যোগ জেলা পর্যায়েও বিস্তারের আহ্বান জানান তিনি।

---

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, এই প্রোটোকল পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য। জেন্ডার-সহায়ক সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ও পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

চ্যানেল আই-এর প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান রনি বলেন, ‘নীতিমালাটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এটিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর এইচআর নীতিতে অন্তর্ভুক্তি জরুরি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়ক বহাল থাকে, আর ভুক্তভোগী চাকরি হারান— এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।’

বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সংগঠন ওকাব সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠুর মতে, দেশে আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। কার্যকর চর্চার মাধ্যমেই এ ধরনের নির্দেশিকা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস অ্যানালিস্ট শারারত ইসলাম বলেন, এটি একটি সহজ ও কার্যকর দলিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন জরুরি, আর বড় গণমাধ্যমগুলো এগিয়ে এলে অন্যরাও উৎসাহিত হবে।

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের প্রোটকল প্রণেতা সুলাইমান নিলয় বলেন, ‘বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এ ক্ষেত্রে কার্যকর। এই নীতিমালা নতুন বাধ্যবাধকতা তৈরি না করে বিদ্যমান দায়িত্ব পালনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’

এর আগে স্বাগত বক্তব্যে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন বলেন, ‘দেশের গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা ১০ শতাংশেরও কম। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ছাড়া এই ভারসাম্য আনা সম্ভব নয়। প্রোটোকলটি মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধতার কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।’

উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (ডব্লিউজেএনবি) কো-অর্ডিনেটর এবং অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আঙ্গুর নাহার মন্টি বলেন, ‘লোকলজ্জার কারণে যৌন হয়রানির বেশিরভাড় ঘটনাই আড়ালে থাকে। সহকর্মীরা নিরাপদ বোধ না করলে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই নীতিমালা নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির প্রাথমিক ভিত্তি; লক্ষ্য নারী-পুরুষ সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’

অনুষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালাটি উপস্থাপন করেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের সিনিয়র মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার আরাফাত সিদ্দিক। তিনি জানান, প্রোটোকলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, সচেতনতা বৃদ্ধি, শাস্তির বিধান স্পষ্টকরণ এবং কার্যকর সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মৌখিক, অনলাইন ও শারীরিক হয়রানির ক্ষেত্রে নারীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

---

তিনি এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে গড়ে ১৫ শতাংশ সংবাদকর্মী কর্মক্ষেত্রে সরাসরি যৌন হয়রানির শিকার। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ান-ইফরা উইমেন ইন নিউজ, ‘সিটি সেন্ট জর্জেস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’ ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন ২০২৫ সালে ২০টি দেশের উপর এই জরিপ পরিচালনা করে। এতে বাংলাদেশের মোট ৩৩৯ জন সাংবাদিক অংশ নেন।

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের তথ্য অনুযায়ী, যৌথ জরিপের অংশগ্রহকারীদের মধ্যে মৌখিক হয়রানির শিকার নারী ৫১ শতাংশ ও পুরুষ ৮ শতাংশ; অনলাইন হয়রানিতে নারী ৪৩ শতাংশ ও পুরুষ ১৪ শতাংশ; শারীরিক হয়রানিতে নারী ২১ শতাংশ ও পুরুষ ৪ শতাংশ। এছাড়া ৭ জন নারী ও ২ জন পুরুষ ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানানো হয়। জরিপে আরও উঠে আসে মৌখিক হয়রানির অভিযোগের ক্ষেত্রে ৪৩ শতাংশ নারী ও ৬০ শতাংশ পুরুষের অভিযোগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সতর্কবার্তায় সীমিত ছিল।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রথম আলো অনলাইন ইংরেজি সংস্করণ সম্পাদক আয়েশা কবীর, সিনিয়র সাংবাদিক মনিমা সুলতানা, শাহনাজ বেগম, নাদিরা কিরণ, নাজনীন আখতার, ইন্টারনিউজের কান্ট্রি প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলি, বৈশাখী টেলিভিশনের হেড অফ নিউজ জিয়াউল কবীর সুমন এবং বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাসিমা আক্তার সোমা।

উপস্থিত ছিলেন ইআরএফ প্রেসিডেন্ট দৌলত আক্তার মালা, ইনস্টিটিউট অফ সাইকোলজি অ্যান্ড হেলথ (আইপিএইচ) পরিচালক সাইকোলজিস্ট নাজমুল হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মিনহাজ উদ্দিন, ডিজিটাল রাইটসের মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক তানভীর সোহেল, চ্যানেল ওয়ানের আমিন আল রশীদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের উপসম্পাদক রাজু আহমেদ, দীপ্ত টিভির হেড অফ নিউজ এস এম আকাশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা সম্মিলিতভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রোটোকলটি বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন।



বিষয়: #



আর্কাইভ