বুধবার ● ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » রাজাকার ইস্যুতে সংসদে ঝড় তুললেন মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান
রাজাকার ইস্যুতে সংসদে ঝড় তুললেন মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান

# অধিবেশনে দু’পক্ষের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, স্পিকারের হস্তক্ষেপ
নিজস্ব প্রতিবেদক
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গণআন্দোলনের তুলনাকে ‘মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা’ আখ্যা দেওয়া, শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াতের রাজনীতি করলে তা ‘ডাবল অপরাধ’— সংসদে এমন সব কঠোর মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে পুলিশ হত্যা ও থানা লুটের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তার এসব মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে দফায় দফায় তুমুল হট্টগোল ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
উভয় পক্ষের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে এক পর্যায়ে সংসদে শোরগোল, প্রতিবাদ এবং পাল্টা বক্তব্যে পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকারের একাধিক বার হস্তক্ষেপে সংসদের পরিবেশ আংশিক নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে মুক্তিযুদ্ধ ও রাজাকার নিয়ে সংসদোও রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফজলুর রহমান তার বক্তব্য শুরু করেন ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি বলেন,‘আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে “ফজা পাগলা” বলে কথা বলে। উনি আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট।’
এ বক্তব্যের পরপরই সংসদে হালকা উত্তেজনা তৈরি হলে স্পিকার প্রশ্ন তোলেন, ‘আপনাকে কি কেউ এই ধরনের উক্তি করেছে? এরকম তো সংসদে কেউ বলেনি।’ জবাবে ফজলুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, করেছে।’ এই বিনিময় থেকেই সংসদে প্রথম দফা উত্তেজনার সূচনা ঘটে।
পরবর্তীতে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে মূল আলোচনায় প্রবেশ করে ফজলুর রহমান সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্যে চলে যান। তিনি বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গণআন্দোলনের তুলনা করা মানে মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা।’
তার বক্তব্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন তিনি বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধ প্রশান্ত মহাসাগর, আর গণআন্দোলন ডোবা। হিমালয়ের সঙ্গে টিলার তুলনা যেমন, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনাও তেমন।’
এই উপমাগুলো সংসদে উপস্থিত বিরোধী সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফজলুর রহমান আরও বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যখন এক মাসের গণআন্দোলনকে তুলনা করা হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা হয়। তখন মনে হয়— হয়তোবা আমি মরে গেলেই ভালো হতো।’
তার বক্তব্যে আবেগ ও রাজনৈতিক অবস্থান মিলেমিশে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অংশটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক মর্যাদা নিয়ে গভীর আবেগঘন অবস্থানও প্রতিফলিত করে।
এরপর তিনি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এত সহজ জিনিস না। আর মুক্তিযুদ্ধ একদিনে হয়নি। পাল বংশ থেকে শুরু করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা— সবকিছুর ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ এসেছে।’
এই অংশে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নেতার নাম উল্লেখ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডারদের স্মরণ করেন। এই ঐতিহাসিক বর্ণনা তার বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এনে জাতীয় ইতিহাসের আলোচনায় রূপ দেয়।
তবে সংসদের উত্তেজনার চূড়ান্ত পর্যায় আসে যখন তিনি বলেন,‘শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে সেটা ডাবল অপরাধ করতেছে।’
তার এই মন্তব্যের পরপরই সংসদে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। বিরোধী সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
পরিস্থিতি শান্ত করতে স্পিকার তখন বলেন,‘মাননীয় সদস্যবৃন্দ, শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। মাননীয় সদস্যকে বলতে দিন।’ কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রায় দশ মিনিট ধরে সংসদের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
এসময় ফজলুর রহমান প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশ করে বলেন,‘এই যে দেখেন, তারা কী ধরনের আচরণ করছে আজকে!’
তার এমন ইঙ্গিতে উত্তেজনা আরও বাড়ে। সংসদীয় পরিবেশ তখন প্রায় অচলাবস্থার দিকে যায়, যা স্পিকারকে কঠোর ভাষায় হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করে। তিনি বলেন,‘এটি জাতীয় সংসদ। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সারা জাতি দেখছে। যদি এই সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না।’
স্পিকারের এই মন্তব্য সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি আরও বলেন,‘আপত্তি থাকলে পরে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করুন। আপনাদের এ ধরনের আচরণে শিশুরাও লজ্জা পাবে।’
এরপর ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে ২০২৪ সালের পুলিশ হত্যা ও থানা লুটের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন,‘৫ আগস্টের পরে যেসব থানা লুট হয়েছে, পুলিশ হত্যা হয়েছে— তারা তো যুদ্ধ করেনি, তারা নিরপরাধ। সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।’ তার এই দাবি নতুন একটি বিতর্কের সূত্রপাত করে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক সহিংসতা প্রসঙ্গ সামনে আসে।
এরপর ফজলুর রহমান তার আলোচনায় যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপনের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন,‘ইতিহাস ভুল বার্তা যাবে যদি আমরা যুদ্ধাপরাধীর ব্যাপারে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।’
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক সতর্কবার্তাও দেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি যাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। দেশের ভেতরে যতই চক্রান্ত হোক, আমার নেতা সংসদ নেতা অনেক মহান কাজ করেছেন। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা আর মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছিল।’ তার এই উপমা রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মুক্তযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর পরই দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন,‘নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি।’
তিনি অভিযোগ করেন,‘তিনি পার্সোনালি আমাকে অ্যাটাক করেছেন। আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে— এটা গুরুতর অপরাধ।’
রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে শফিকুর রহমান বলেন,‘আমি কোন দল করবো, কোন আদর্শ অনুসরণ করবো— এটি আমার নাগরিক অধিকার।’
তিনি স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন,‘তার এই অসংসদীয় অংশটা এখান থেকে এক্সপাঞ্জ করা হোক।’ শফিকুর রহমান আরও বলেন,‘যুক্তি যখন ফুরিয়ে যায়, মাথা তখন গরম হয়ে যায়।’
এই পর্যায়ে সংসদে আবার উত্তেজনা তৈরি হলে স্পিকার দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন এবং সংসদীয় বিধি মেনে চলার ওপর জোর দেন।
পরবর্তী পর্যায়ে আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্য ঘিরেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়, যা প্রমাণ করে যে ওই দিনের অধিবেশনটি ধারাবাহিকভাবে উত্তপ্ত ছিল। পার্থের বক্তব্যের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন,‘আমি এ ধরনের রেকলেস কথা বলি না।’
এতে আবারও শোরগোল শুরু হয় এবং ডেপুটি স্পিকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি।’
তিনি সংসদে সহনশীলতা ও ঐক্যের ওপর জোর দেন। একই আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করা যায় না।’
তিনি ভবিষ্যতের আন্দোলনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের তুলনার বিরোধিতা করেন এবং বাস্তব রাজনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অন্যদিকে হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন,‘সংঘাত ও হানাহানির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
সংসদে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক ধীরে ধীরে জাতীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক আদর্শ, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং সংসদীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে বিস্তৃত হয়। স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও, এ দিনের অধিবেশন প্রমাণ করেছে— মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অবস্থান এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর বিভাজনের উৎস হয়ে আছে।
বিষয়: #রাজাকার ইস্যুতে সংসদে ঝড় তুললেন মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমা





গায়েবি হত্যা মামলা থেকে কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দিন: নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট
হামের উপসর্গে একদিনে ১১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ছাড়াল ২শ’
’মত প্রকাশের কারণে ধরে আনা হচ্ছে, মত-দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই’
’বাকস্বাধীনতা মানে কারো পরিবার নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা নয়’
পদ্মা সেতুসহ ৩ মেগা প্রকল্পের দুর্নীতির তদন্ত চলছে: সংসদে সেতুমন্ত্রী
বজ্রাঘাতে একদিনে ১৪ জনের মৃত্যু, ৭ জেলায় শোকের ছায়া
ইসিতে আপিল করলেন এনসিপির মনিরা শারমিন
মাধবী মারমার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ইসিতে আপিল
এনআইডির নতুন ডিজি পরিকল্পনা বিভাগের আনোয়ার পাশা 
