শিরোনাম:
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Swadeshvumi
মঙ্গলবার ● ৯ জুন ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিলো সংসদ
প্রচ্ছদ » জাতীয় » ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিলো সংসদ
১ বার পঠিত
মঙ্গলবার ● ৯ জুন ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিলো সংসদ

 

বাজেট অধিবেশনের তৃতীয় দিন

---

# এই ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতি মাটির সাথে মিশে যাবে- বিরোধীদলীয় নেতা

# ’ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতও ইসলাম নয়; আগের সব হরিলুটের তদন্ত হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

# ব্যাংকটি বিএনপি সরকারের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ-অর্থমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের তৃতীয় দিনে ইসলামী ব্যাংক ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়েছে। ব্যাংকটির মালিকানা, শেয়ার দখল, এস আলম গ্রুপের ভূমিকা, নিয়োগ বাণিজ্য, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে সংসদে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ আমলে রাষ্ট্রীয় প্রভাব খাটিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল ও দুর্বল করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারপক্ষ দাবি করেছে, ব্যাংকটিকে পুনরায় স্থিতিশীল ও প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে সরকার কাজ করছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তিনি অভিযোগ করেন, এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সহায়তায় প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে শেয়ার দখল করেছে। তার ভাষায়, “ব্যাংকটি একসময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আস্থার প্রতীক ছিল। আজ সেটিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছে।”

তিনি দাবি করেন, এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে সেই অর্থ দিয়েই ব্যাংকের শেয়ার কিনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তিনি বলেন, “যাদের কাছ থেকে জোর করে শেয়ার নেওয়া হয়েছে, তাদের কাছে তা ফিরিয়ে দিতে হবে।” একই সঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যানকে অপসারণ এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের দাবি জানান তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো দল বা গোষ্ঠীর ব্যাংক নয়। এখানে সব রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ধর্মের মানুষের হিসাব রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, “যদি প্রমাণ করতে পারেন ইসলামী ব্যাংকের ৭০০ কোটি টাকা জামায়াতের নির্বাচনী তহবিলে গেছে, তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে মেডেল দেব।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট আমলে কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই প্রায় ১০ হাজার কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একসময় এককভাবে ব্যাংকটি দেশের মোট বৈদেশিক রেমিট্যান্সের প্রায় ৩২ শতাংশ পরিচালনা করত। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই আস্থার সংকট তৈরি হবে।”

---

ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্প রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। তার দাবি, নির্বাচনের আগে নারী গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাব তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যার কোনো সঠিক হিসাব নেই।”

তিনি আরও বলেন, নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকা এবং হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই একটি গোষ্ঠীকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম তদন্ত করা হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকে ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ৬ হাজার নতুন নিয়োগ ও ১৩ হাজার পদোন্নতির অভিযোগও তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি এখতিয়ারের মধ্যেই চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

---

আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপি ও বর্তমান সরকারের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ। তিনি বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাই এই ব্যাংকের মর্যাদা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

অর্থমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকরা টাকা তুলে নিচ্ছেন—এমন বক্তব্য বাস্তবসম্মত নয়। তার ভাষায়, “বিশ্বের কোথাও গ্রাহক চেয়ারম্যানের নাম দেখে টাকা জমা রাখে না।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইনি প্রক্রিয়ায় ইসলামী ব্যাংককে প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করছে। একই সঙ্গে দেশের আর্থিক খাতকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে বলেও জানান তিনি।

ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৫১ শতাংশ। ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যাংকটি প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনেছে বলেও জানান তিনি।

এর আগে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা জরিমানার তথ্যও সংসদে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনায় মোট ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তিনি জানান, বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক ও আইএফআইসি গ্রিন জিরো কুপন বন্ড সংক্রান্ত ঘটনায় সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ অনেকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্টার্ট-আপ, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে বিড়ির মূল্য ও করহার অপরিবর্তিত থাকবে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সংসদকে জানান, ঢাকায় ‘স্মার্ট পোস্ট বক্স’ স্থাপন করা হবে এবং ‘আমার ডাক’ অ্যাপের মাধ্যমে ডাকসেবাকে অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি সরকার ‘সাইবার সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি ২০২৬-২০৩০’ প্রণয়ন করছে বলেও জানান তিনি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় তরুণদের আইটি দক্ষতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে এক হাজার গ্র্যাজুয়েটকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে ১৩টি দেশে চাকরির সুযোগ তৈরি হবে বলেও সংসদে জানানো হয়।

অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে এখনই দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বড় বিনিয়োগ করতে হবে।



বিষয়: #



আর্কাইভ