শিরোনাম:
ঢাকা, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
Swadeshvumi
শনিবার ● ২৫ জুলাই ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি বিধি-বিধান, ইতিহাস ও বিতর্ক
প্রচ্ছদ » জাতীয় » রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি বিধি-বিধান, ইতিহাস ও বিতর্ক
২ বার পঠিত
শনিবার ● ২৫ জুলাই ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি বিধি-বিধান, ইতিহাস ও বিতর্ক

---

 

শায়লা শবনম

 

দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। ফলে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি কাঠামো, অতীতের নির্বাচন, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং এবারের নির্বাচনের তাৎপর্য নিয়ে জনমনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কে হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি? সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের নাম নিয়েও চলছে গুঞ্জন। 

 

বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য থাকায় সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন।

 

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, খুব শিগগিরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ভোটার তালিকা প্রস্তুত, তফসিল ঘোষণাসহ নির্বাচনের সার্বিক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণে তৎপরতা শুরু করেছে। সংসদের বিরোধী দল এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে আলোচনা।

 

সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালিত হয় সংবিধান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী। সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অথবা পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।

সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলী (Electoral College)। বর্তমানে ৩০০টি সাধারণ আসন এবং ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন মিলিয়ে মোট ৩৫০ জন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতার বিষয়টি সংবিধানের ৪৮(৪) অনুচ্ছেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে হলে প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, ন্যূনতম ৩৫ বছর বয়সী হতে হবে এবং জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য আগে সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকাই যথেষ্ট।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। তফসিলে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহার এবং প্রয়োজনে ভোটগ্রহণের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়।

 

আলোচনায় আছেন যারা

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। এছাড়া সাবেক আমলা ও সাবেক প্রধান বিচারপতিদের কয়েকজনের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব জানিয়েছে, দলের স্থায়ী কমিটি ও নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকের পরই রাষ্ট্রপতি পদে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। ফলে বর্তমানে প্রচারিত সব নামই রাজনৈতিক আলোচনা ও জল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।

 

কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণ জাতীয় নির্বাচনের মতো নয়। এটি সংসদভিত্তিক একটি সাংবিধানিক নির্বাচন। জাতীয় সংসদের সদস্যরাই ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। যদি একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর একজন মাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

 

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন, গণআন্দোলন এবং একাধিক সাংবিধানিক সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতা ও ভূমিকা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।

১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি মূলত সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকায় ফিরে আসেন। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন।

 

সংসদীয় যুগের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ, এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ (দুই মেয়াদ) এবং সর্বশেষ মো. সাহাবুদ্দিন। এর মধ্যে অধিকাংশ নির্বাচনই ছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার। কারণ ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সাধারণত একজন প্রার্থীই বৈধভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকেন। ফলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না এবং একক প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

 

রাষ্ট্রপতি পদে যত পদত্যাগ 

৫৪ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পদত্যাগ করেছেন মোট ছয়জন। তারা হলেন—বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (১৯৭৩), বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম (১৯৭৭), বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী (১৯৮৩), হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ (১৯৯০), এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (২০০২) এবং সর্বশেষ মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন (২০২৬)। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিহত হন, জিল্লুর রহমান দায়িত্বে থাকাকালেই মৃত্যুবরণ করেন এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও বিচারপতি আবদুস সাত্তার সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাংবিধানিক পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে রয়েছে। 

 

সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে ২০০৯ সালের নির্বাচন বিশেষভাবে আলোচিত। ২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থা, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পালাবদলের পর অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই নির্বাচন। নতুন সংসদের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিল্লুর রহমানের নির্বাচনকে সে সময় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল।

এ ছাড়া ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর এটিই ছিল প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ের অধিকাংশ নির্বাচন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পন্ন হওয়ায় ১৯৯১ সালের নির্বাচন এখনও একটি ব্যতিক্রমী নজির হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয় এবং প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায় না। অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের প্রতিফলন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে সংবিধানে কোথাও বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী যেকোনো দল বা সদস্য আইন অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিতে পারেন। যদিও বাস্তবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের প্রার্থীই নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।

 

কেন ২০২৬ সালের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়; এটি দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে সৃষ্ট শূন্য পদে সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর এটিই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সম্ভাব্য প্রার্থী, সংসদে দলগুলোর অবস্থান, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং নতুন রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকা—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে নির্বাচন ও শপথ—পুরো প্রক্রিয়ার দিকে এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে। 

 



বিষয়: #



আর্কাইভ