শিরোনাম:
ঢাকা, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
Swadeshvumi
বুধবার ● ২২ জুলাই ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক
প্রচ্ছদ » জাতীয় » গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক
১ বার পঠিত
বুধবার ● ২২ জুলাই ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক

নৈতিক স্খলনে বহিষ্কার

---

 

# সংসদের মর্যাদা রক্ষায় ব্যবস্থা দাবি, আইনে বহিষ্কারেই বাতিল নয়

শায়লা শবনম

জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ থাকবে কি না—এ প্রশ্নে শুরু হয়েছে সাংবিধানিক বিতর্ক। একদিকে আইনজীবী ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি বহিষ্কৃত হলে তার এমপি পদে বহাল থাকার নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। 

অন্যদিকে সংবিধান ও প্রচলিত নির্বাচনি আইনের ভাষ্য বলছে, শুধু দলীয় বহিষ্কারের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদত্যাগ, সংবিধানে বর্ণিত অযোগ্যতা সৃষ্টি কিংবা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় স্পিকার, নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং প্রয়োজনে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসেও কেবল নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে কোনো এমপি সদস্যপদ হারিয়েছেন—এমন প্রতিষ্ঠিত নজির নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক তদন্ত শেষে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দল জানিয়েছে, বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

বহিষ্কারের পর প্রতিক্রিয়া

ঘটনার পর সাবেক এনসিপি নেত্রী ডা. তাসনিম জারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, অভিযোগ সত্য হলে ‘মহান সংসদ’-এর মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তার ভাষায়, অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কলঙ্কমুক্ত হবেন; আর সত্য হলে সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির মনে করেন, গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ বহাল থাকার সুযোগ নেই। ফেসবুকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘পদত্যাগ’-এর কথা বলা হলেও এখানে ঘটেছে ‘বহিষ্কার’। তবে যেহেতু জামায়াত বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানাচ্ছে, তাই এটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির দিকে যাবে। তার ভাষায়, “প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কিনা? আমার মতে, না।” শিশির মনিরের মতে, বহিষ্কারের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকার আইনি ভিত্তি আর অবশিষ্ট থাকে না।

সংবিধান কী বলছে?

তবে সংবিধানের ভাষ্য কিছুটা ভিন্ন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি (ক) দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা (খ) সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে।

একই অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দলের নির্দেশ অমান্য করে ভোটদানে বিরত থাকা বা সংসদে অনুপস্থিত থাকাও দলের বিপক্ষে ভোটদানের সমতুল্য হিসেবে গণ্য হবে।

কিন্তু পুরো অনুচ্ছেদে কোথাও ‘দল থেকে বহিষ্কার’-কে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আইন বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশেও (আরপিও) এমন কোনো বিধান নেই যে, রাজনৈতিক দল কোনো এমপিকে বহিষ্কার করলেই তার সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।

এ কারণেই সাংবিধানিক প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দল কর্তৃক বহিষ্কার কি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ‘পদত্যাগ’-এর সমতুল্য ধরা যাবে, নাকি যাবে না? এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর সংবিধানে নেই।

কী করবে নির্বাচন কমিশন?

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এ বিষয়ে বলেন, “দলীয় চিঠি পেলে কমিশন সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। সংবিধান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আগে চিঠি আসুক, তারপর দেখা যাবে।”

তিনি জানান, সংসদ সদস্যের আসনসংক্রান্ত বিষয়ে সংসদ সচিবালয় ও স্পিকারের ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্ত পেলেই নির্বাচন কমিশন আসন শূন্য ঘোষণা করবে—এমন কোনো বিধান নেই।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদও জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কমিশনে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি আসেনি। চিঠি পাওয়ার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জেসমিন টুলীর ভিন্ন ব্যাখ্যা

ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী অবশ্য নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্যকে দল বহিষ্কার করলে তার এমপি হিসেবে বহাল থাকার নৈতিক ভিত্তি থাকে না।

তিনি বলেন, “দল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে একজন প্রতিনিধিকে বহিষ্কার করে, তাহলে তিনি আর সেই দলের প্রতিনিধি নন। দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে বহিষ্কারের পর এমপি হিসেবে থাকার নৈতিক যোগ্যতা থাকে না।”

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, আসন শূন্য ঘোষণা করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নয়। এটি সংসদের স্পিকার ও সংসদ সচিবালয়ের বিষয়। স্পিকার আসন শূন্য ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করবে এবং এরপর উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে।

ইতিহাস কী বলে

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে কোনো এমপির সদস্যপদ বাতিল হওয়ার সুস্পষ্ট নজির নেই।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে ঘিরে। হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর তিনি দলীয় সদস্যপদ ও মন্ত্রিত্ব হারান। পরে তার সংসদ সদস্যপদ নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হলে স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠান। কমিশন শুনানির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই লতিফ সিদ্দিকী সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ তার সদস্যপদ বহিষ্কারের কারণে নয়, স্বেচ্ছা পদত্যাগের মাধ্যমে শূন্য হয়েছিল।

অন্যদিকে ২০২১ সালে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে মন্ত্রিত্ব ছাড়লেও সংসদ সদস্যপদ বহাল ছিল। এটিও দেখায় যে রাজনৈতিক বা নৈতিক দায় এবং সংসদ সদস্যপদ— দুটি ভিন্ন সাংবিধানিক বিষয়।

এখন কী হতে পারে?

আইনজ্ঞদের মতে, জামায়াত নির্বাচন কমিশনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানালে কমিশন প্রথমে বিষয়টি নথিভুক্ত করবে। এরপর সংবিধান, আরপিও এবং সংসদ সচিবালয়ের অবস্থান পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন হলে স্পিকারের মতামত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় আসতে পারে।

বর্তমান অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলাম নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেননি, সংসদে দলের বিপক্ষেও ভোট দেননি। ফলে সংবিধানের বর্তমান ভাষ্য অনুযায়ী শুধু বহিষ্কারের ভিত্তিতে তার সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে— এমন স্পষ্ট আইনি বিধান নেই। তবে বিষয়টি সাংবিধানিক ব্যাখ্যার পর্যায়ে গেলে আদালতের রায় কিংবা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত এ বিতর্কের নিষ্পত্তি করবে।

 



বিষয়: #



আর্কাইভ