শিরোনাম:
ঢাকা, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২
Swadeshvumi
সোমবার ● ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » আন্তর্জাতিক » সাংবাদিক মার্ক টালি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু
প্রচ্ছদ » আন্তর্জাতিক » সাংবাদিক মার্ক টালি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু
৫ বার পঠিত
সোমবার ● ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সাংবাদিক মার্ক টালি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু

---


আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরপেক্ষ ও সাহসী সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি। বিবিসির ‘ভয়েস অব ইন্ডিয়া’ খ্যাত এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ৯০ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন বিবিসির সাবেক সহকর্মী সতীশ জ্যাকব।

ইংরেজ পরিবারে জন্ম হলেও মার্ক টালির জীবনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কেটেছে ভারতে। দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানের সামরিক শাসন, ভারতের জরুরি অবস্থা, শিখ বিদ্রোহ, ইন্দিরা ও রাজিব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের বিদ্রোহ এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসির কণ্ঠস্বর

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপের কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা যখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন বিবিসির মাধ্যমে নিয়মিত যুদ্ধের খবর ও বিশ্লেষণ প্রচার করে বাঙালির আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন মার্ক টালি।

গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী একসময় বিবিসি বাংলাকে বলেন, “তখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিবিসি মানেই ছিল মার্ক টালি। যাদের বাড়িতে রেডিও ছিল, তারা সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে তার কণ্ঠ শোনার অপেক্ষায় থাকতেন।”

মুক্তিযুদ্ধকালে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। ওই সম্মাননা গ্রহণ করতে ২০১২ সালে তিনি শেষবারের মতো ঢাকায় আসেন।

যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে মার্ক টালি

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস পর, ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন মার্ক টালি। পাকিস্তানের সামরিক সরকার ওই সময় একবারের জন্য টালিসহ মাত্র দুজন বিদেশি সাংবাদিককে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল।

প্রায় দুই সপ্তাহের সেই সফরে তিনি ঢাকা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত সড়কপথে ভ্রমণ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফ-এর যুদ্ধ সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ। সফরকালে প্রত্যক্ষ করা ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাযজ্ঞের বিবরণ তিনি বিবিসিতে সরেজমিন প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরেন।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে দেখেছি, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তখনই বুঝেছিলাম, কী ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চলছে।”

---

কীভাবে সংগ্রহ হতো মুক্তিযুদ্ধের খবর

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকার প্রায় সব সংবাদপত্র ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ফলে স্থানীয় গণমাধ্যমে হত্যা, নির্যাতন কিংবা মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের খবর প্রকাশ পেত না। অন্যদিকে ভারতীয় গণমাধ্যম বা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও সবসময় নির্ভুল তথ্য পাওয়া যেত না।

এই প্রেক্ষাপটে বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিশেষ করে মার্ক টালির প্রতিবেদনের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হয়। ঢাকায় স্বল্প সময় অবস্থানের পর তিনি লন্ডনে ফিরে গিয়ে কলকাতা, শরণার্থী শিবির, বিবিসি বাংলা বিভাগ এবং দেশের ভেতরে থাকা সংবাদদাতাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্ববাসীর সামনে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরেন।

যাজক হতে চেয়েছিলেন, হলেন কিংবদন্তি সাংবাদিক

১৯৩৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মার্ক টালি। তার বাবা ছিলেন ইংরেজ এবং মা বাঙালি। শৈশবে দার্জিলিংয়ে পড়াশোনার পর তিনি ব্রিটেনে যান। একসময় খ্রিস্টান যাজক হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেন, যদিও তা শেষ করতে পারেননি।

১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দিয়ে পরের বছর নয়াদিল্লিতে ফিরে এসে সাংবাদিকতা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিবিসির দিল্লি ব্যুরো প্রধান হন। ১৯৭৫ সালে ভারতের জরুরি অবস্থার সময় তাকে বহিষ্কার করা হলেও পরে আবার দায়িত্বে ফেরেন।

সম্মাননা ও সাহিত্যকর্ম

সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ভারত সরকার তাকে ১৯৯২ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ সম্মাননায় ভূষিত করে। ২০০২ সালে তিনি ‘নাইট’ উপাধিও লাভ করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে No Full Stops in India এবং Amritsar: Mrs Gandhi’s Last Battle।

মার্ক টালির মৃত্যুতে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতায় এক অনন্য অধ্যায়ের অবসান হলো—যিনি সাহস, সততা ও মানবিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।



বিষয়: #



আর্কাইভ