শুক্রবার ● ১৩ মার্চ ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » সংসদে দিনভর নাটকীয়তা, উত্তেজনা
সংসদে দিনভর নাটকীয়তা, উত্তেজনা
![]()
# সংসদ সভাপতি ড. খন্দকার মোশারফ, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল
# অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণের বিরোধিতা, বিরোধীদলের ওয়াকআউট
# খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব
# অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন
# অধিবেশন ১৫ মার্চ সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি
শায়লা শবনম
প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় বিরতির পর আবারও সচল হলো দেশের আইনসভা। নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। তবে সংসদের প্রথম দিনেই দেখা গেছে উত্তেজনা, প্রতিবাদ, সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা এবং রাজনৈতিক বার্তার সমন্বয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে সংসদের ভেতরে-বাইরে বিরোধী দলের প্রতিবাদ, শোকপ্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াকআউট— সব মিলিয়ে প্রথম দিনের অধিবেশন ছিল দিনভর নাটকীয়তায় ভরা।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর সকাল ১১টা ৫ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
প্রথম দিনের অধিবেশনে জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অস্থায়ীভাবে সভাপতিত্ব করেন। সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বহু সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে আবারও একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংসদের যাত্রা শুরু হলো। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদকে যুক্তি, তর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য।
অধিবেশনের শুরুতেই কণ্ঠভোটে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হয়। পরে সংসদ ভবনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের পর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশনের কার্যক্রম আবার শুরু হয়। এ সময় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর নাম ঘোষণা করা হয়।
অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান বক্তব্যে বলেন, জাতীয় সংসদ যেন ব্যক্তির চরিত্র হননের মঞ্চে পরিণত না হয়। তিনি মন্তব্য করেন, অতীতে অনেক সময় সংসদে জনস্বার্থের আলোচনার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ বেশি হয়েছে। বর্তমান সংসদ ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় সংসদকে কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে বলেন, এই সংসদ সেই আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শহীদদের রক্তের সঙ্গে কেউ যাতে বেইমানি না করে—এটাই এখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা।
প্রথম অধিবেশনে স্পিকারের দুই পাশের ভিভিআইপি লাউঞ্জসহ চারপাশের দর্শক গ্যালারিগুলো আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। ভিভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ছিলেন তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান, তার মা সৈয়দা ইকবাল মান্দবানু, কন্যা জাইমা রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিনী শামিলা রহমান সিঁথি। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ শহীদ গোলাম নাফিজকে রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়া রিকশাচালক নুর মুহাম্মদকেও অতিথি হিসেবে দর্শক গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
অধিবেশনের প্রথম দিন সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রকাশ করা হয়। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বহু সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। আলোচনার পর প্রয়াতদের স্মরণে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
তবে শোক তালিকায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কয়েকজন নেতার নাম যুক্ত হওয়ায় সংসদে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিদের নাম শোক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।
নতুন সংসদের সামনে বড় আইনগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ বিল আকারে পাস না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ফলে নতুন সংসদের আইন প্রণয়ন কার্যক্রমের শুরুতেই এসব অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এদিকে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে এসেছে। জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলো গণভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং সাংবিধানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
অধিবেশন ঘিরে সংসদের বাইরেও রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা যায়। সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন, গণভোট অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার বিচার দাবিতে তারা এই কর্মসূচি পালন করে।
বিকেলে অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ কক্ষে প্রবেশ করলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারদলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর আগেই বিরোধীদলীয় সদস্যরা ‘ফ্যাসিবাদের দালালেরা হুঁশিয়ার’, ‘গেট আউট’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং সংসদের রীতি অনুসরণ করা সবার দায়িত্ব।
একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু হলে বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। সংসদ কক্ষে প্রায় পাঁচ মিনিট বিক্ষোভের পর তারা কক্ষ ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে বিকেলের দিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ অধিবেশন আগামী ১৫ মার্চ সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন। ওই দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় কার্যদিবস শুরু হবে।
প্রথম দিনের অধিবেশনকে ঘিরে গণভোট অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি আর প্রতীকী প্রতিবাদে সংসদের ভেতর বাইরে ছিলো রাজনৈতিক উত্তেজনা। ফলে নতুন সংসদের কার্যক্রম যে বিতর্ক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েই এগোবে— প্রথম দিনেই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত।





নজিরবিহীন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ভোটে দায়বদ্ধ সংসদ গড়াই লক্ষ্য: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
অধিবেশনের শুরুতেই যান্ত্রিক গোলযোগ
গণমাধ্যমে যৌন হয়রানি রোধে ৩ প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব, দুটি সমঝোতা চুক্তি
ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু
দোহা থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ২টি বিশেষ ফ্লাইট
ফেব্রুয়ারিতে সড়কে নিহত ৪৩২ জন : রোড সেফটি ফাউন্ডেশন
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস
নারীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার: তারেক রহমান
সীমিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে এমিরেটস 
