শিরোনাম:
ঢাকা, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২
Swadeshvumi
সোমবার ● ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » অপরাধ » ‘ভালো বাপ, ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস’: জুয়েল হাসান সাদ্দাম
প্রচ্ছদ » অপরাধ » ‘ভালো বাপ, ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস’: জুয়েল হাসান সাদ্দাম
৪ বার পঠিত
সোমবার ● ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

‘ভালো বাপ, ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস’: জুয়েল হাসান সাদ্দাম

বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম

# কারাগারের গেটে মৃত স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ, প্যারোল বিতর্ক ও মানবিক প্রশ্ন

শায়লা শবনম

“ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস। ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস”— জুয়েল হাসান সাদ্দামের এই কথাগুলো শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও মানবিকতার সীমারেখা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। গত শনিবার যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে মৃত স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে এক বন্দির নিঃশব্দ ক্ষমাপ্রার্থনা—এই দৃশ্য এখন দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

দাফনের আগে কারাগারের গেটে শেষ দেখা

বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে শনিবার মধ্যরাতে দাফন করা হয় গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ও তার নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানকে। তার আগে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ দুটি আনা হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে, যেখানে বন্দি স্বামী ও পিতার সঙ্গে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য শেষ সাক্ষাৎ ঘটে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত আটটার দিকে মরদেহ নিয়ে কারাগারে পৌঁছানো হয় এবং পাঁচ মিনিটের জন্য জুয়েল হাসান সাদ্দামকে গেইটে আনা হয়। সে সময় তার হাতে হাতকড়া ছিল না।

‘বাচ্চাকে জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারিনি’

জুয়েল হাসান সাদ্দামের ভাই মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “বাচ্চাটা জীবিত অবস্থায় কখনো বাবার কোলে আসতে পারেনি। তাই কারাগারের গেইটেও আমার ভাই তাকে কোলে নেয়নি। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছে—আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস।”

তিনি আরও বলেন, স্ত্রী কানিজ সুবর্ণাকে উদ্দেশ করে সাদ্দাম বলেন, “ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস।” এরপর সেখানকার মাটি তুলে পরিবারের হাতে দিয়ে বলেন, “আমার বউ-বাচ্চার কবরে দিস।”

---

একের পর এক ব্যর্থ চেষ্টা

পরিবার জানায়, সন্তানের জন্মের পর কানিজ সুবর্ণা অন্তত পাঁচবার শিশুটিকে নিয়ে কারাগারের গেইটে গিয়েছিলেন—এই আশায় যে, অন্তত একবার হলেও বাবা সন্তানকে কোলে নিতে পারবেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে ভেতরে নেওয়া হয়। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি।

শুক্রবার কানিজ সুবর্ণার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় এবং পাশে শিশুর নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর দাফনের আগে জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য সাদ্দামের প্যারোল চেয়ে পরিবার দৌড়ঝাঁপ শুরু করে।

প্যারোল নিয়ে পরিবার ও প্রশাসনের ভিন্ন দাবি

পরিবারের দাবি, তারা বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করতে গেলে সেটি গ্রহণ না করে যশোরের জেল সুপার বা জেলা প্রশাসকের কাছে যেতে বলা হয়। এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে পাঠিয়ে সময় নষ্ট করা হয়।

কানিজ সুবর্ণার ভাই শাহ নেওয়াজ আমিন শুভ বলেন, “আমরা আবেদন করেছি, কিন্তু তা গ্রহণই করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত বলা হয়—লাশ নিয়ে যশোর কারাগারের গেইটে গেলে পাঁচ মিনিট দেখা করতে দেওয়া হবে।”

অন্যদিকে যশোর জেলা প্রশাসনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্যারোলের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়নি। মৌখিক আবেদনের ভিত্তিতে মানবিক কারণে কারাগারের গেইটে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই বক্তব্য দিয়েছে।

---

প্রশাসনিক প্রক্রিয়া না মানবিক নিষ্ঠুরতা?

মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশাসনের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, “এই ঘটনা রাষ্ট্রের অমানবিক চেহারা প্রকাশ করেছে। একটু সদিচ্ছা থাকলে একজন বন্দি তার স্ত্রী-সন্তানকে সম্মানের সঙ্গে শেষ বিদায় জানাতে পারতেন।”

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সম্পাদক সাইদুর রহমান বলেন, “আমাদের কাছে তথ্য আছে—লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। তা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যা ঘটেছে, তা এক ধরনের প্রশাসনিক নিষ্ঠুরতা।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ

কারাগারের গেইটে লাশ দেখার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা—“মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে”—এই একটি লাইন ঘিরে অসংখ্য পোস্টার, গ্রাফিক্স ও ফটোকার্ড তৈরি হয়।

অনেকে একে রাষ্ট্রীয় অমানবিকতা বললেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে—প্রশ্ন হচ্ছে, এখনো কেন ঘটবে?

---

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে ছিলেন। পরে গোপালগঞ্জ থেকে আটক হন। গ্রেপ্তারের সময় তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এরপর একাধিক মামলায় তিনি কারাগারে রয়েছেন।

এই রাজনৈতিক পরিচয়ও প্রশাসনিক আচরণে প্রভাব ফেলেছে কি না—সে প্রশ্নও উঠছে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে।

মানবিকতার পরীক্ষায় রাষ্ট্র

যশোর কারাগারের গেইটে এই পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎ এখন আর শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়। এটি আইন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রের মানবিকতার একটি কঠিন পরীক্ষা।

প্রশাসন বলছে, নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নিয়মের মধ্যেই মানবিক হওয়ার সুযোগ ছিল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন— রাষ্ট্র কি কেবল নিয়ম মানবে, নাকি মানুষের দুঃখের মুহূর্তে মানুষ হিসেবেও দাঁড়াবে?

 



বিষয়: #  #  #



আর্কাইভ