শুক্রবার ● ৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » গণভোটসহ ২০ অধ্যাদেশ বাতিল
গণভোটসহ ২০ অধ্যাদেশ বাতিল
বিশেষ কমিটির রিপোর্ট সংসদে উত্থাপন
![]()
বিশেষ প্রতিনিধি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পথে এগোচ্ছে জাতীয় সংসদ। দীর্ঘ যাচাই–বাছাই শেষে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটি ২০টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করে তাদের প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপন করেছে। একই সঙ্গে অধিকাংশ অধ্যাদেশ আইন হিসেবে বহাল রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে বৃহস্পতিবার রাতে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যালোচিত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অবিকল বহাল রাখা, ১৫টি সংশোধন করে আইন হিসেবে গ্রহণ এবং ২০টি বাতিল বা বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারির পর পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাওয়ার বিধান রয়েছে। সে হিসেবে এই ২০টি অধ্যাদেশ আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে ল্যাপস হয়ে যাবে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো অধ্যাদেশগুলোর আলোকে বিল উত্থাপন ও পাস না হলে এগুলোর ভবিষ্যত অনিশ্চিত। ল্যাপসের তালিকায় যাওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ১২টি অধ্যাদেশে জামায়াতের তিন সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। বাতিল হওয়া কিছু অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে সংসদে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাতিল ১৬টি পরবর্তী সময়ে যাচাই–বাছাই
বিশেষ কমিটি ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তীতে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে। সেগুলো হচ্ছে- গণভোট অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন), মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন), কাস্টমস (সংশোধন), আয়কর (সংশোধন), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (দ্বিতীয় সংশোধন), দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন), বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন), বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন), মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন, মাইক্রো ফাইনান্স ব্যাংক এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
বিশেষ কমিটির মতে, এসব অধ্যাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনই আইন হিসেবে পাস করার মতো পর্যাপ্ত পর্যালোচনা হয়নি। তাই এগুলো আপাতত বাতিল হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ভবিষ্যতে নতুন করে বিল আকারে সংসদে আনতে পারে।
৪ অধ্যাদেশ স্থায়ীভাবে বাতিলের প্রস্তাব
বিশেষ কমিটি চারটি অধ্যাদেশ সরাসরি রহিত করার সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো—জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ। এ বিষয়ে কমিটির মতে, এসব অধ্যাদেশ বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং আইন হিসেবে বহাল রাখার প্রয়োজন নেই।
৯৮ অধ্যাদেশ বহাল রাখার সুপারিশ
বিশেষ কমিটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধিকাংশ অধ্যাদেশ আইন হিসেবে বহাল রাখার মতো উপযুক্ত। এ কারণে ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই সংসদে উত্থাপন করে পাস করার সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আরও ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে নতুন আইন হিসেবে প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে আইন হিসেবে প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন), ব্যাংক রেজুলেশন, সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন), কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধন), জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন), মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন, পুলিশ কমিশন, ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যাবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন), মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ দমন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণও কৃষি ভূমি সুরক্ষা, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন), বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারি অবসর সুবিধা (সংশোধন) এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারি কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এসব অধ্যাদেশে কিছু নীতিগত ও কারিগরি সংশোধন প্রয়োজন হলেও এগুলো রাষ্ট্রের প্রশাসন ও নীতি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিরোধী দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’
যদিও প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বসম্মতভাবে সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে কয়েকটি বিষয়ে কমিটির বিরোধী দলীয় সদস্যরা আপত্তি জানিয়েছেন। তারা কয়েকটি অধ্যাদেশের বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা দ্বিমত নথিভুক্ত করেছেন। জামায়াত সমর্থিত সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম ১২টি অধ্যাদেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, কিছু অধ্যাদেশ অপরিবর্তিতভাবে বহাল রাখা কিংবা বাতিলের সুপারিশ যথাযথ নয়। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের ‘কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের আলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ সংবিধানবিরোধী হতে পারে।
বিশেষ কমিটির ইতিবৃত্ত
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ধারাবাহিক তিনটি বৈঠকে অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করে। এরপর সংসদে আলোচনা শেষে প্রতিবেদনটির সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া আইনি পদক্ষেপগুলোকে স্থায়ী কাঠামোর মধ্যে আনতেই এই যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে নতুন আলোচনা
এদিকে সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হচ্ছে। বুধবার সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক এ বিষয়ে একটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। স্পিকার জানিয়েছেন, সংসদের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারি দলের সদস্যের আনা মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। কার্যপ্রণালি বিধির ৬৫(২) অনুযায়ী প্রস্তাবটি গ্রহণ করে আগামী ৫ এপ্রিল দুই ঘণ্টা আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদের আওতায় সংবিধান সংশোধনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনও এখনো আহ্বান করা হয়নি, ফলে বিষয়টি নিয়ে সংসদে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিপুল সংখ্যক অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদীয় কমিটির এই প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব অধ্যাদেশের মধ্যেই নির্বাচন, প্রশাসন, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থাসংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।
একদিকে সংসদীয় যাচাই–বাছাইয়ের মাধ্যমে অনেক অধ্যাদেশ স্থায়ী আইন হওয়ার পথে এগোচ্ছে, অন্যদিকে বিতর্কিত বা অসম্পূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল বা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে সামনে সংসদে যে আলোচনা হতে যাচ্ছে, তা কেবল আইনি কাঠামোই নয়— দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়: #গণভোটসহ ২০ অধ্যাদেশ বাতিল





সংসদে গণভোটসহ ১৬ অধ্যাদেশ ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল’ হচ্ছে
অডিটের জন্য এনবিআরের ৬০০ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন
সিলেটে সব পেট্রল পাম্প ও সিএনজি স্টেশন বন্ধ ঘোষণা
‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল না
জলবায়ু ট্রাস্টের প্রকল্পে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে
অনৈতিক উপায়ে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া ব্যক্তিদের জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে
অনলাইনে ক্লাসের কথাও ভাবা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায়: শিক্ষামন্ত্রী
সংসদে উত্তপ্ত ফ্লোর: গণভোট ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিতর্ক তুঙ্গে
হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন: প্রধানমন্ত্রী 
