শিরোনাম:
ঢাকা, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২
Swadeshvumi
সোমবার ● ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক: ইসির অবস্থান পরিবর্তন
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক: ইসির অবস্থান পরিবর্তন
৩০ বার পঠিত
সোমবার ● ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক: ইসির অবস্থান পরিবর্তন

---

শায়লা শবনম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে। বিশেষ করে দেশে ও প্রবাসে একই ধরনের পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত, ব্যালটে প্রার্থীর নাম ও ছবি না থাকা এবং শতাধিক প্রতীকের জটিল বিন্যাস— সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে ভোটের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

এই বিতর্কের মুখেই শেষ পর্যন্ত অবস্থান পরিবর্তন করেছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপিসহ একাধিক পক্ষের আপত্তির পর সিদ্ধান্ত হয়েছে— দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়া অনুমোদিত ভোটারদের জন্য আসনভিত্তিক প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক সংযুক্ত করে আলাদা ব্যালট ছাপানো হবে। কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে পোস্টাল ব্যালট বিতর্কে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা। তবে তারা বলছেন, সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

দেশের পোস্টাল ব্যালটে থাকবে প্রার্থীর নাম

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটারদের ব্যালটে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক যুক্ত থাকবে। শনিবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের জানান, এই সিদ্ধান্ত কেবল দেশের অভ্যন্তরের পোস্টাল ভোটারদের জন্য প্রযোজ্য হবে। প্রবাসী ভোটারদের জন্য আগের মতো কেবল প্রতীকসম্বলিত ব্যালটই বহাল থাকবে।

ইসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রবাসে ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আনতে গড়ে ২০ দিন সময় লাগে। সে কারণে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বিদেশে কেবল প্রতীকসংবলিত ব্যালট পাঠানো হয়েছে। তবে দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হবে ২৩ জানুয়ারি থেকে। এর আগে ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দসহ প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হয়ে যাবে। ফলে দেশের ব্যালটে প্রার্থীর নাম যুক্ত করতে কোনো কারিগরি বাধা নেই।

বিএনপির আপত্তি ও চাপের প্রভাব

পোস্টাল ব্যালট বিতর্কের মূল চাপ এসেছে বিএনপির দিক থেকে। দলটির অভিযোগ ছিল— দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটে সাধারণ ব্যালটের মতোই আসনভিত্তিক প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক থাকা উচিত। একই ব্যালটে দেশের সব আসনের শতাধিক প্রতীক দিয়ে ভোট নেওয়া অযৌক্তিক ও ভোটার বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আরও অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, ব্যালট ভাঁজ করলে ধানের শীষ প্রতীক আংশিক ঢেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রকাশ্য আপত্তি, ধারাবাহিক বৈঠক এবং গণমাধ্যমে সমালোচনার পরই ইসি তাদের প্রাথমিক অবস্থান থেকে সরে আসে।

দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটার কতজন?

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য অনুমোদিত ভোটারের সংখ্যা ৭ লাখ ৬০ হাজার ৯৩৯ জন। অনলাইনে আবেদন করেছিলেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন, তবে তথ্যগত ত্রুটির কারণে ২০২টি আবেদন বাতিল হয়।

এই ভোটারদের মধ্যে রয়েছেন— নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্যানেলভুক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা এবং কারাবন্দি আসামিরা। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের জন্য আসনভিত্তিক প্রার্থীদের নামসহ আলাদা ব্যালট ছাপানো কমিশনের জন্য বড় ধরনের লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

দেশে-বিদেশে একই ব্যালট নিয়ে কেন আপত্তি

শুরুর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশে ও বিদেশে সব পোস্টাল ভোটারকে একই ধরনের দুই পৃষ্ঠার ব্যালট দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ওই ব্যালটে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক গেজেটের ক্রমানুসারে সাজানো হয়। ‘না’ ভোটের অপশনসহ মোট প্রতীকের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২০টি।

বিএনপির যুক্তি ছিল— একটি নির্দিষ্ট আসনের ভোটারকে তার আসনের বাইরের শতাধিক প্রতীকের ভিড়ে নিজের পছন্দ খুঁজে নিতে বাধ্য করা অযৌক্তিক এবং বিভ্রান্তিকর। শেষ পর্যন্ত এই যুক্তিকেই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছে নির্বাচন কমিশন।

পোস্টাল ব্যালটের ব্যয় ও আস্থার প্রশ্ন

পোস্টাল ব্যালট–ভোট পদ্ধতিতে ভোটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে ব্যালট ছাপানো, ডাকযোগে পাঠানো ও ফেরত আনা এবং প্রশাসনিক খরচ অন্তর্ভুক্ত। যদিও ইসি বলছে, দেশের জন্য আলাদা ব্যালট ছাপানোর সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে না, তবু ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের চাপ বাড়ছে।

বিশ্বের ১০৪টি দেশ থেকে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রবাসী। অনেক আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা সরাসরি জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলীর মতে, দেশের জন্য আলাদা ব্যালট ছাপানোর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে প্রথমবার এত বড় পরিসরে পোস্টাল ভোট চালু হওয়ায় আস্থা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। তার আগে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক কতটা প্রশমিত হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই নতুন ভোটব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।






আর্কাইভ