শিরোনাম:
ঢাকা, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
Swadeshvumi
মঙ্গলবার ● ৩ মার্চ ২০২৬
প্রচ্ছদ » প্রধান সংবাদ » মিরপুরের বেনারসি পল্লী: ক্রেতাশূন্য অধিকাংশ দোকান, লোকসানে ৩০ ভাগ ব্যবসায়ী
প্রচ্ছদ » প্রধান সংবাদ » মিরপুরের বেনারসি পল্লী: ক্রেতাশূন্য অধিকাংশ দোকান, লোকসানে ৩০ ভাগ ব্যবসায়ী
২১ বার পঠিত
মঙ্গলবার ● ৩ মার্চ ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

মিরপুরের বেনারসি পল্লী: ক্রেতাশূন্য অধিকাংশ দোকান, লোকসানে ৩০ ভাগ ব্যবসায়ী

---

শায়লা শবনম

রাজধানীর মিরপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী বেনারসি পল্লী—যে বাজার একসময় বিয়ের মৌসুমে ক্রেতার ঢল আর রঙিন শাড়ির ঝলকে মুখর থাকত—সেখানে এখন ঈদের মৌসুমেও বিরাজ করছে অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা। সন্ধ্যা গড়ালেও অধিকাংশ দোকানে নেই কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা। বিক্রেতারা কেউ মোবাইল ফোনে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ সাজানো শাড়ি আবার ভাঁজ করে তুলে রাখছেন।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এবার ঈদ বাজারেও জমেনি বিক্রি। তাদের হিসাব বলছে—প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যবসায়ী লাভে থাকলেও ৫০ শতাংশ কোনোমতে টিকে আছেন। আর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে লোকসানে পড়েছেন।

ঈদ নয়, বিয়েই মূল ভরসা

বেনারসি পল্লীর ব্যবসার ধরন মৌসুমনির্ভর। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই চার মাস বিয়েশাদির মৌসুমে বাজারে প্রাণ ফেরে। বছরের বাকি সময়, বিশেষ করে রমজানের ঈদকে ঘিরে প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে বিক্রি কম থাকে।

নাজ বেনারসির বিক্রেতা মতিউর রহমান জানান, “শুক্র ও শনিবার কিছুটা ক্রেতা আসে। কিন্তু ঈদ আমাদের মূল মৌসুম না। বিয়ের সময়ই বিক্রি ভালো হয়। বাকি সময় দোকান চালানোই কঠিন।”---

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদে পরিবারকেন্দ্রিক কেনাকাটা বেশি হয়। বেনারসি পল্লী যেহেতু মূলত শাড়িকেন্দ্রিক বিশেষায়িত বাজার—এখানে বেনারসি, জামদানি, কাতান, অর্গানজা, কানি সিল্কসহ নানা শাড়ি মিললেও পুরুষ ও শিশুদের পোশাক বা অন্যান্য উপহারসামগ্রী সীমিত। ফলে পরিবারের সবার কেনাকাটা একসঙ্গে করা যায় না। এ কারণেই সাধারণ ক্রেতারা বড় শপিং মল বা বহুমুখী মার্কেটে ঝুঁকছেন।

ধীরগতির বাজার, বেতন-বোনাসে অনিশ্চয়তা

বেনারসি বিগ বাজারের স্বত্বাধিকারী মো. আনিসুর রহমান বলেন, “গত দুই বছর ঈদের বাজার ভালো ছিল না। এবারও শুরুটা ধীর। চাকরিজীবীরা বেতন-বোনাস পেলে হয়তো বিক্রি বাড়বে।”

তিনি জানান, ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত দামের শাড়ি রয়েছে তার দোকানে। এ বছর পার্টি শাড়ি, সুতার কাজ করা নেট ও অর্গানজা শাড়ির চাহিদা তুলনামূলক বেশি। ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ভারতীয় কাশ্মিরি কানি সিল্কও বিক্রি হচ্ছে।

তবে তৌসিফ বেনারসির বিক্রেতা ফারুক হোসেনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। “গতকাল পাঁচটি শাড়ি বিক্রি হয়েছে। আজ এখনো বিক্রি শুরুই হয়নি,” বলেন তিনি। তার মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে মানুষের হাতে অর্থপ্রবাহ বাড়বে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শৌখিন পণ্যের সংকট

ব্যবসায়ীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে সরাসরি এই বাজারে। বেনারসি বা কানি সিল্কের মতো পণ্য মূলত শৌখিন ও অনুষ্ঠানের পোশাক। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে মানুষ আগে সেগুলোতেই খরচ সীমিত করে।

শাড়ি কুঞ্জের স্বত্বাধিকারী জাহিদ রহমান বলেন, “গত বছরের চেয়েও এ বছর বিক্রি খারাপ। মানুষ এখন নিত্যপণ্যের দাম নিয়েই বেশি চিন্তিত। শৌখিন পণ্যে খরচ কমছে।”

তার অভিযোগ, বিক্রির ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাটের চাপ রয়েছে। বাজারে মন্দা থাকলেও কর কাঠামোয় কোনো বিশেষ ছাড় নেই।

---

উচ্চ বিনিয়োগ, বের হওয়ার পথ নেই

বেনারসি পল্লীতে ব্যবসা শুরু করতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, একটি দোকান নিতে সিকিউরিটি বাবদ ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা অগ্রিম দিতে হয়। সাজসজ্জায় খরচ প্রায় ২০ লাখ টাকা। পণ্যে বিনিয়োগ থাকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত।

পাবনা বেনারসি মিউজিয়ামের স্বত্বাধিকারী মো. শামীম আকরাম বলেন, “এখানে ঢুকলে বের হওয়ার সুযোগ নেই। ২৫ শতাংশ লাভে, ৫০ শতাংশ টিকে আছে, আর বাকি ২৫ শতাংশ লোকসানে।” তার ভাষ্য, শাড়ি রড-সিমেন্টের মতো নয় যে সহজে পাইকারি বিক্রি করে বের হওয়া যাবে। একবার বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ছাড়া উপায় নেই।

তাঁতিদেরও সংকট

এই বাজারের সঙ্গে জড়িত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতি ও কারিগররা। একটি শাড়ি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও উৎপাদন খরচ বাদে তাঁতির হাতে লাভ থাকে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা। বিক্রি কমে গেলে তাদের পাওনাও আটকে যায়। ফলে সংকট ছড়িয়ে পড়ে পুরো উৎপাদন শৃঙ্খলে।

ব্যবসায়ীরা জানান, বেনারসি পল্লীর প্রায় ৫০ শতাংশ চাহিদা ভারতনির্ভর পণ্যের দিকে ঝোঁকে, বিশেষ করে জর্জেট ও সিল্ক ধরনের কিছু শাড়িতে। তবে দেশীয় বেনারসি ও জামদানির গুণগত মানে তারা আস্থা রাখছেন।

শেষ ভরসা ‘লাস্ট আওয়ার’ ক্রেতা

অভিজ্ঞতা বলছে, রমজানের শেষ সপ্তাহে হঠাৎ করে কখনো কখনো ক্রেতার ঢল নামে। অনেকেই বেতন-বোনাস হাতে পেয়ে শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা করেন। সেই আশাতেই দিন গুনছেন ব্যবসায়ীরা।

দিয়া শাড়ি ঘরের ম্যানেজার রাজু আহমেদ বলেন, “এখন পর্যন্ত যে বিক্রি, তাতে কর্মচারীদের বেতন উঠবে কি না সন্দেহ। ঈদের বোনাস কীভাবে দেব—সেই চিন্তা আছে। তবে শেষ সপ্তাহে কিছুটা ভিড় বাড়ার আশা করছি।”

মিরপুরের বেনারসি পল্লী এখন এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও বিয়ের বাজারের ঐতিহাসিক সুনাম; অন্যদিকে ক্রেতার রুচির পরিবর্তন, পারিবারিক কেনাকাটার নতুন ধারা, উচ্চ বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক চাপ।

ঈদের বাজারে যখন অন্যান্য শপিং মল সরব, তখন বেনারসি পল্লীর অধিকাংশ দোকানই ক্রেতাশূন্য। তবু আশাবাদ হারাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রত্যাশা— শেষ মুহূর্তে বাজারে নগদ প্রবাহ বাড়লে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াবে ঐতিহ্যের এই বাজার। কিন্তু যদি সেই প্রত্যাশা পূরণ না হয়, তবে লোকসানে থাকা ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ীর জন্য সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন সময়।






আর্কাইভ