শিরোনাম:
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
Swadeshvumi
সোমবার ● ২৯ জুন ২০২৬
প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » বাজেট বাস্তবায়নে আত্মবিশ্বাসী সরকার: মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও সংস্কারে জোর
প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » বাজেট বাস্তবায়নে আত্মবিশ্বাসী সরকার: মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও সংস্কারে জোর
১৪ বার পঠিত
সোমবার ● ২৯ জুন ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বাজেট বাস্তবায়নে আত্মবিশ্বাসী সরকার: মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও সংস্কারে জোর

বাজেট সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী 

---

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।

সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, সরকার এমন সময়ে বাজেট প্রণয়ন করেছে, যখন একদিকে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বাস্তবতা ছিল, অন্যদিকে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। তাই এ বাজেট কেবল একটি বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নয়; বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি রূপরেখা।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কৌশল

উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এটিকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করছে। এজন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, ব্যবসা সহজীকরণে ডিরেগুলেশন ও ডিজিটাইজেশন, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে আশাবাদ

প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক আস্থার প্রতিফলন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাতের সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

তিনি জানান, সরকার ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’—এই ‘থ্রিআর’ কৌশলের আওতায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

করের হার নয়, বাড়বে করভিত্তি

রাজস্ব আহরণ নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার করের হার বাড়িয়ে নয়, করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে চায়। এজন্য রাজস্ব নীতি ও প্রশাসন পৃথকীকরণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সামর্থ্যভিত্তিক ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের সুযোগ রাখা হলেও কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এ ব্যবস্থার বাইরে থাকবে।

তিনি দাবি করেন, সরকারের স্বল্প সময়ের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায় চার লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

উন্নয়ন ব্যয়ে জোর, কমবে পরিচালন ব্যয়

সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতির কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয়ের অংশ ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি

অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার ফলে দেশের ঋণ পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন, অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন, ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিং এবং বিদেশে বাংলাদেশভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক খাত সংস্কার ও পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকার আন্তর্জাতিক আইনি উদ্যোগ জোরদার করেছে। মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে-বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে দুটি আইনি সহযোগিতা চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।

একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। অবশিষ্ট অর্থ পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে। ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী ও হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ সুবিধাও রাখা হয়েছে।

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে কর প্রণোদনা

পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কার্যকর উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে একাধিক কর-সুবিধার প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো, শেয়ার অফলোডে অতিরিক্ত কর ছাড়, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কর সুবিধা এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতের বিদ্যমান সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, এসব পদক্ষেপের ফলে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে।

ব্যবসা সহজীকরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় জোর

অর্থমন্ত্রী বলেন, ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং রাষ্ট্রকে বিনিয়োগবান্ধব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি নির্মাণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি।

বাস্তবায়নই হবে বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

বক্তব্যের শেষদিকে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটের সফলতা ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে নিহিত। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। তবে ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্প তদারকি, দক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চায়।

তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার খাতকে সামনে রেখেই বাজেট বাস্তবায়ন করা হবে এবং প্রতিটি বিনিয়োগে ‘ভ্যালু ফর মানি’, ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।



বিষয়: #  #



আর্কাইভ