শিরোনাম:
ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩
Swadeshvumi
মঙ্গলবার ● ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে সরকারের সঙ্গে ইসির দূরত্ব!
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে সরকারের সঙ্গে ইসির দূরত্ব!
১৯ বার পঠিত
মঙ্গলবার ● ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে সরকারের সঙ্গে ইসির দূরত্ব!

---

শায়লা শবনম

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে কমিশনের অবস্থানগত ভিন্নতা প্রকাশ্যে এসেছে। নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা জানিয়েছে ইসি। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলছে, প্রস্তাবিত তারিখ সম্পর্কে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। ফলে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সম্ভাব্য দিন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সরকারের ভেতরেও।

এরই মধ্যে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসির ‘একক কোনো এখতিয়ার নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে কমিশন বলছে, এখনো কোনো চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা করা হয়নি; এটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।

এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ইসির আইনগত কর্তৃত্ব, সরকারের প্রশাসনিক সহায়তা এবং দুই পক্ষের সমন্বয়ের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।

সরকার জানে না ভোটের তারিখ

ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে তারা ইসির ঘোষিত সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে জেনেছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সরকারের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ কিংবা আলোচনা হয়নি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তুতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য আসার পরই ইসি ঘোষিত রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।

‘ইসির একক এখতিয়ার নেই’

বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে। মঙ্গলবার সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ইসির ‘একক কোনো এখতিয়ার নেই’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, তার সঙ্গে সমন্বয় করেই ইসি নির্বাচন আয়োজন করবে। প্রয়োজন হলে আলোচনার মাধ্যমে কমিশনের ঘোষিত সম্ভাব্য তারিখ পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে বিষয়টিকে সরকার ও ইসির সরাসরি সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

রোডম্যাপ এখনো চূড়ান্ত নয়

সরকারের বক্তব্যের বিপরীতে নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট করেছে, তারা কোনো চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা করেনি। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে—এটি নিশ্চিত। তবে কবে এবং কীভাবে নির্বাচন হবে, সে বিষয়ে কমিশনের প্রাথমিক আলোচনা চলছে।

তিনি জানান, সোমবার একটি প্রাথমিক সময়সূচি তৈরি করা হয়েছে। এতে পাঁচ ধাপে নির্বাচন আয়োজনের ধারণা রয়েছে এবং আরও দুটি ধাপ সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে কমিশনের পক্ষ থেকে নভেম্বর থেকে আগামী বছরের মে মাস পর্যন্ত সাতটি সম্ভাব্য তারিখের কথাও জানানো হয়েছিল। এসব তারিখকে চূড়ান্ত তফসিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ইসি সচিব বলেন, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভা হবে। শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি, সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হবে। এসব মতামত পাওয়ার পর কমিশন সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।

দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চললে প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও বৈঠকে বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও বৈঠক

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর ২১ সেপ্টেম্বর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় সভা করবে নির্বাচন কমিশন। এতে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার-ভিডিপি, র‌্যাব, ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, এসবি, ডিবি ও সিআইডির প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বৈঠকে আলোচনায় আসবে।

অর্থাৎ ইসির ঘোষিত সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় হয়নি—এমন অভিযোগ থাকলেও এখন দুই পক্ষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরি হচ্ছে।

‘নির্দলীয় হলেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়’

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হলেও বাস্তব রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। ফলে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকার ও ইসির মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংসদ নির্বাচনের মতো নয়। মাঠ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকারের সীমানা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও অন্যান্য বাস্তব বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই ইসিকে সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সমন্বয় করেই এগোতে হবে।

জেসমিন টুলীর মতে, ইসির ঘোষিত সম্ভাব্য তারিখকে এখনই চূড়ান্ত তফসিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়সূচি চূড়ান্ত করা উচিত। এতে ভুল বোঝাবুঝি ও বিভ্রান্তিও কমবে।

‘আইনি দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার’

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীমও ইসির ঘোষিত তারিখকে সম্ভাব্য হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা হয়নি। ফলে প্রয়োজন হলে সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তার মতে, সরকার ও ইসির বক্তব্যের ভিন্নতাকে সরাসরি বিরোধ হিসেবে না দেখে আইনি ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সীমানা নির্ধারণ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, বাজেট এবং অন্যান্য সহায়তার ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ফলে নির্বাচন আয়োজনের বাস্তব প্রস্তুতিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

ড. আব্দুল আলীম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসির আইনগত দায়িত্ব ও এখতিয়ার আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। এতে নির্বাচন আয়োজনের সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে এবং স্থানীয় সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচন আয়োজন সহজ হবে।

কর্তৃত্ব ইসির, সহায়তায় সরকার

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে মূল বিতর্কের জায়গাটি হচ্ছে—নির্বাচন পরিচালনার আইনগত কর্তৃত্ব কার এবং সেই নির্বাচন আয়োজনের বাস্তব প্রস্তুতিতে সরকারের ভূমিকা কতটা।

সংবিধানের ১১৯(২) অনুচ্ছেদে সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ওপর অর্পিত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার আইন ও বিধির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব ইসির ওপর ন্যস্ত রয়েছে। অন্যদিকে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইসির দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য।

অর্থাৎ নির্বাচন পরিচালনার আইনগত দায়িত্ব কমিশনের ওপর থাকলেও মাঠ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, জনবল, অবকাঠামো, বাজেটসহ নানা বাস্তব প্রস্তুতিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে দুই বৈঠক, নজর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ করার পর এবার মেয়াদোত্তীর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এরই অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ তথ্য নেওয়া, সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ, ভোটার তালিকা ও সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতসহ বিভিন্ন কাজ এগিয়েছে।

তবে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করতেই সামনে এসেছে সরকার ও ইসির মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন। একদিকে সরকার বলছে, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ জানেনি; অন্যদিকে ইসি বলছে, এটি কেবল প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা, চূড়ান্ত তফসিল নয়।

ফলে ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভা এবং ২১ সেপ্টেম্বর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য তারিখ অপরিবর্তিত থাকে, নাকি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তা পরিবর্তন করা হয়—সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

সব মিলিয়ে, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত যে দূরত্ব দৃশ্যমান হয়েছে, তা সরাসরি সংঘাতের চেয়ে বরং আইনগত কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের প্রশ্ন হিসেবেই বেশি স্পষ্ট হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা বজায় রেখেই সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করাই হতে পারে এই দূরত্ব কমানোর প্রধান পথ।



বিষয়: #



আর্কাইভ