শিরোনাম:
ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
Swadeshvumi
রবিবার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রচ্ছদ » মুক্তমত » সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড! কিছু প্রশ্ন
প্রচ্ছদ » মুক্তমত » সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড! কিছু প্রশ্ন
২ বার পঠিত
রবিবার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড! কিছু প্রশ্ন

 

---

শায়লা শবনম

একজন নাগরিকের জীবনের মূল্য কতটা? বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার বিচার হবে—আইন অনুযায়ী শাস্তিও হতে পারে। কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান রেখেই এ কথা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া থেকে শুরু করে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত নিজ রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা কী ভূমিকা পালন করবেন? নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি মৃত্যুর খবর জানার পর একটি চিঠি পাঠানোর মধ্যেই শেষ হয়ে যায়?

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় এসব প্রশ্নই সামনে এসেছে। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্তের পর তাদের আদালতে হাজির করা হয়, আদালত মৃত্যুদণ্ড দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও রাজকীয় আদেশের পর সেই দণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশিত বিবৃতিতে বিস্তারিত তথ্য নেই।

এখানে অপরাধের অভিযোগের সত্যতা কিংবা সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই বিচারপ্রক্রিয়ায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থন, দোভাষী পাওয়ার সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা এবং আপিলের অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়েছিল কি না। তাদের পরিবার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে কতটা জানত? বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট তাদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল কি?

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কেন জানতে হলো?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট—কেউই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে এ বিষয়ে অবহিত ছিল না। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ বিষয়টি জানতে পারে। এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়।

প্রশ্ন হলো, একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত তার নিজ দেশের কূটনৈতিক মিশন কীভাবে পুরোপুরি অন্ধকারে থাকল? গ্রেপ্তার, তদন্ত, অভিযোগ গঠন, বিচার, রায়, আপিল কিংবা রায় চূড়ান্ত হওয়ার মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এত দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কোনো পর্যায়েই কি সংশ্লিষ্ট মিশনের কাছে তথ্য পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়নি? নাকি তথ্য পৌঁছালেও তা যথাযথভাবে নথিভুক্ত ও অনুসরণ করা হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ দূর হবে না।

এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের দায় ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা—দুটিই আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে অবহিত না করে থাকলে সেটি এক ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে; আর বাংলাদেশের মিশন আগে থেকে কিছু জেনে থাকলেও যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে থাকলে সেটি হবে ভিন্ন ধরনের জবাবদিহির বিষয়।

ভিয়েনা কনভেনশন কী বলে?

১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশে আটক ব্যক্তির সঙ্গে তার দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী, আটক ব্যক্তি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষকে বিলম্ব না করে তার দেশের কনস্যুলার দপ্তরকে আটকের বিষয়টি জানাতে হবে।

আটক ব্যক্তিকে তার এই অধিকার সম্পর্কেও অবহিত করার বিধান রয়েছে। কনস্যুলার কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, সাক্ষাৎ এবং আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করার সুযোগও পান। অর্থাৎ, কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বিদেশে আটক নাগরিকের আইনি সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই কনভেনশনের বিধানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না যে, প্রতিটি গ্রেপ্তারের খবর সব পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূতাবাসকে জানানো বাধ্যতামূলক।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুরোধসহ অনুচ্ছেদে নির্ধারিত শর্তগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এখন জানতে হবে, নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারকে তাদের কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না। তারা কি বাংলাদেশের কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিলেন? তাঁরা সহায়তা চেয়েছিলেন কি না, চাইলে তা দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

দূতাবাস কি শুধু পাসপোর্ট ও কাগজপত্রের কাজ করবে?

সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। অথচ বিদেশে কোনো শ্রমিক আইনি জটিলতায় পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, এই ঘটনা সেই প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে।

প্রবাসীদের বিপদের সময়ে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভূমিকা শুধু কাগজপত্র তৈরি, পাসপোর্ট নবায়ন কিংবা শ্রমবাজারের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কোনো বাংলাদেশির ক্ষেত্রেও আইনসম্মতভাবে কনস্যুলার সহায়তা, উপযুক্ত আইনজীবীর খোঁজ, দোভাষীর প্রয়োজন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি অনুসরণের উদ্যোগ থাকা দরকার।

এ জন্য সৌদি আরবসহ যেসব দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত, সেখানে কার্যকর আইনি সহায়তা সেল গড়ে তোলা জরুরি। আটক বা গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার জন্য ডিজিটাল কেস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে কোনো মামলার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যেন নজরদারির বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাই

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এখন সেই উদ্যোগ কত দূর এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়। তবে শুধু একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রয়োজন হলে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, বিচারিক নথি, রায়ের ভিত্তি এবং কনস্যুলার যোগাযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইতে হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁরা আগে কোনো তথ্য পেয়েছিলেন কি না, পেয়ে থাকলে কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, আর তথ্য না পেয়ে থাকলে মামলাটি শনাক্ত করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা উচিত।

আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তার অধিকার শেষ হয়ে যায় না। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে; কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ায় তার অধিকার রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে। এখন আর তাদের জন্য বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তারা ন্যায়সংগত বিচার পেয়েছিলেন কি না এবং বাংলাদেশ তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।

কারণ, আজ এই দুই নাগরিকের ঘটনায় যে প্রশ্ন উঠেছে, আগামীকাল তা অন্য কোনো প্রবাসী বাংলাদেশির জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসতে পারে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল রেমিট্যান্সের হিসাব রাখা নয়; বিদেশের মাটিতে বিপদে পড়া নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় যথাসাধ্য উদ্যোগ নেওয়াও তার দায়িত্ব। কারণ প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন— তারা এই রাষ্ট্রের নাগরিক। বিপদের সময়ে তাদের পাশে উপস্থিতি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক



বিষয়: #



আর্কাইভ