সোমবার ● ১৫ জুন ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » ফ্যামিলি কার্ড: ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক
ফ্যামিলি কার্ড: ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক
![]()
শায়লা শবনম
দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’—এই দর্শন সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬’। নতুন এ ব্যবস্থায় প্রতিটি পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে প্রকৃত দরিদ্রদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা, ভাতা ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং এক ব্যক্তি বা পরিবারের একাধিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ বন্ধ হবে বলে আশা করছে সরকার।
সোমবার (১৫ জুন) সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ফ্যামিলি কার্ড প্রদান সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির চতুর্থ সভায় ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা ও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ফ্যামিলি কার্ড >
◆ ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন
◆ প্রস্তাবিত কার্ডটি হবে ‘ডুয়াল ইন্টারফেস স্মার্ট চিপ’ কার্ড
◆ সামাজিক নিরাপত্তায় তৈরি হচ্ছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ডেটাবেজ
◆ প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা
◆ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশা সংশ্লিষ্টদের
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিমালা কেবল একটি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি নয়; এটি হবে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি ডিজিটাল রূপান্তর। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), ‘ওয়ান-আইডি’, ‘ফ্যামিলি ট্রি’ এবং সমন্বিত ডেটাবেজের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়ন করে সুবিধা নির্ধারণ করা হবে।
নীতিমালার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের মাতা বা জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। এর মাধ্যমে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়বে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
কী থাকছে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডে
প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ডটি হবে একটি ‘ডুয়াল ইন্টারফেস স্মার্ট চিপ’ কার্ড। এতে থাকবে এনএফসি ও স্মার্ট চিপ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে এটিএম বুথ, ব্যাংকিং চ্যানেল এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা যাবে।
কার্ডে একটি কিউআর কোড থাকবে, যা মাঠ পর্যায়ে তাৎক্ষণিক পরিচয় যাচাইয়ে ব্যবহৃত হবে। এমনকি ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও কার্ডে সংরক্ষিত তথ্যের মাধ্যমে সুবিধাভোগীর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এক পরিবার, এক আইডি
নতুন নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ‘ওয়ান-আইডি’ নম্বর চালু করা। ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক বৃক্ষের মাধ্যমে পরিবারের সব সদস্যের তথ্য এই আইডির সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এটি জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং আইবাস++-এর সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে একই ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক উৎস থেকে সরকারি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
কীভাবে নির্ধারণ হবে উপকারভোগী
প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্তে সরকার ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ (পিএমটি) স্কোরিং পদ্ধতি ব্যবহার করবে। পরিবারের আয়, সম্পদ, জমি, জীবনযাত্রার মান ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে একটি স্কোর নির্ধারণ করা হবে।
এই স্কোরের ভিত্তিতে পরিবারগুলোকে অতি দরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং সচ্ছল—এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। হাওর, চর, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকার পরিবারগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরাসরি অর্থ পৌঁছাবে উপকারভোগীর হাতে
নতুন ব্যবস্থায় কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের মাধ্যমে নয়, সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো হবে। এতে কমিশন, ঘুষ কিংবা অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে বলে মনে করছে সরকার।
কারা পাবেন না ফ্যামিলি কার্ড
নীতিমালায় কঠোর বর্জন নীতিও রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি পেনশনভোগী, পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বা স্থায়ী আমানতধারী, চার চাকার গাড়ির মালিক, নিয়মিত আয়করদাতা এবং নির্ধারিত সীমার বেশি জমির মালিকরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন না।
এআই দিয়ে নজরদারি
ডেটাবেজে কোনো অসঙ্গতি বা জালিয়াতি ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হবে। কেউ ভুল তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা শনাক্ত করে ব্লক করবে। পাশাপাশি লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুবিধাভোগীর পরিচয় যাচাই করা হবে।
দেশব্যাপী নতুন জরিপ
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্যভাণ্ডার তৈরির জন্য জনশুমারি ২০২২-এর তথ্যের ভিত্তিতে নতুন করে দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনা করা হবে। মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ‘পেপারলেস ডেটা কালেকশন’ এবং জিও-ট্যাগিং প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবারের অবস্থান ও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
১৪ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচি
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সক্রিয় তদারকির মাধ্যমে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি) মো. সাইফুল হক বলেন, সরকারের সব ধরনের ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা হবে, যাতে কেউ দ্বৈত সুবিধা নিতে না পারে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা রাষ্ট্রীয় সহায়তা পান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি হবে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার নতুন ডিজিটাল ভিত্তি। এর মাধ্যমে নগদ সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও অন্যান্য সামাজিক সেবাও একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নিরসন ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে এই ফ্যামিলি কার্ডকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা।
বিষয়: #পরিবারই উন্নয়নের মূল একক #ফ্যামিলি কার্ড: ব্যক্তি নয়





অর্থনীতি পুনর্গঠনে ব্যয়সংকোচন ও সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব
বাস টার্মিনালগুলো ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সরকারি প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ: আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
ধর্ষণ ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ, স্পিকারের রুলিং
ইসি পাবে ৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা
জাতীয় সংসদের বরাদ্দ প্রস্তাব ২৯১ কোটি টাকা
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা 
