বৃহস্পতিবার ● ১১ জুন ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » বাজেটের ইতিহাস: তাজউদ্দীন থেকে আমির খসরু
বাজেটের ইতিহাস: তাজউদ্দীন থেকে আমির খসরু
![]()
* যুদ্ধকালীন অর্থনীতি থেকে ৯ লাখ কোটির বাংলাদেশ
শায়লা শবনম
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত এক অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। শিল্প-কারখানা ধ্বংসপ্রাপ্ত, অবকাঠামো বিধ্বস্ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্যের কোঠায়—এমন বাস্তবতা থেকে শুরু হওয়া দেশের অর্থনীতি আজ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। ৫৫ বছরের এই যাত্রাপথ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নয়, বরং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন কৌশলেরও প্রতিচ্ছবি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্বাধীনতার পর বাজেট উপস্থাপনকারী তিনি ১৫তম ব্যক্তি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসের সূচনা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ পরিচালনার প্রয়োজন মেটাতে একটি অন্তর্বর্তী বাজেট অনুমোদন করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। সেই বাজেটের মূল লক্ষ্য ছিল পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বৈশ্বিক তেল সংকট, খাদ্যাভাব ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাজেট ছিল টিকে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নীতিগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
আশির দশকে বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি, ব্যাংক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছিল বাজেটের প্রধান আলোচ্য বিষয়। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ভ্যাট চালু, কর কাঠামো আধুনিকীকরণ, বাণিজ্য উদারীকরণ ও বাজারমুখী সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন মোড় আনেন। আজকের রাজস্ব ব্যবস্থার ভিত্তি মূলত সেই সময়েই গড়ে ওঠে।
একই সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিরও সূচনা হয়। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে শাহ এ এম এস কিবরিয়া বয়স্ক ভাতা চালু করেন। অল্প পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীতে রূপ নিয়েছে।
স্বাধীনতার পর প্রায় তিন দশক লেগেছিল বাজেটকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ঘরে নিতে। ২০০৯ সালে প্রথমবার জাতীয় বাজেট ১ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে। এরপর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে ৪ লাখ কোটি, ২০২০ সালে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি, ২০২৩ সালে ৭ লাখ ৬১ হাজার কোটি এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের তুলনায় বর্তমান বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১,২০০ গুণেরও বেশি।
বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বাজেট উপস্থাপনের রেকর্ড যৌথভাবে এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিতের। দুজনই ১২টি করে বাজেট পেশ করেছেন। টানা ১০টি বাজেট উপস্থাপনের রেকর্ড এখনও মুহিতের দখলে।
এবারের বাজেটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও কম নয়। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান, ব্যাংক ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভর করতে চায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি— এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে।
দীর্ঘ ৫৫ বছরের বাজেট ইতিহাস একটি বড় সত্যও সামনে আনে। সরকার বদলেছে, অর্থমন্ত্রী বদলেছেন, অর্থনৈতিক দর্শন পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু রাজস্ব ঘাটতি, খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগ সংকটের মতো চ্যালেঞ্জগুলো বারবার ফিরে এসেছে। তবুও ৭৮৬ কোটি টাকার পুনর্গঠনের বাজেট থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নমুখী বাজেটে পৌঁছানো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অভিযাত্রার এক অনন্য সাফল্যের গল্প। তাজউদ্দীন আহমদের পুনর্গঠনের স্বপ্ন থেকে আমির খসরুর ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির প্রত্যাশা— এই দীর্ঘ পথচলাই বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন।
বিষয়: #বাজেটের ইতিহাস: তাজউদ্দীন থেকে আমির খসরু





ইসি পাবে ৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা
জাতীয় সংসদের বরাদ্দ প্রস্তাব ২৯১ কোটি টাকা
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা
নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ৫,১৯৬ কোটি টাকা
শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রস্তাব
কৃষি ঋণ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ
নতুন পে-স্কেল ঘোষণা, কার বেতন কত?
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার সারসংক্ষেপ 
