বৃহস্পতিবার ● ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » প্রধান সংবাদ » চিকিৎসকদের পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রশ্নবিদ্ধ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
চিকিৎসকদের পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রশ্নবিদ্ধ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

# গত তিন মাসে ১ হাজার ৪০০ চিকিৎসককে পদোন্নতি
# চাকরিবিধি উপেক্ষিত, পদোন্নতি বঞ্চিত ৮৭৯ চিকিৎসক
শায়লা শবনম
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য প্রশাসনে চিকিৎসকদের পদোন্নতি ছিল নিয়ম, জ্যেষ্ঠতা ও মেধাভিত্তিক— তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে প্রায় ২ বছরে সেই ব্যবস্থা নানা অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মাত্র তিন মাসের সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, বৈষম্য ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় যা ঘটছে, তা কেবল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নয়— এটি সরাসরি বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর), প্রাকৃতিক বিচারনীতি এবং সাংবিধানিক সমতার নীতির লঙ্ঘন
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক পদে ১ হাজার ৪০০ চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে সরকারি চাকরিবিধি (বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস) উপেক্ষা করে ৮৭৯ জন যোগ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে কোনো লিখিত কারণ ছাড়াই পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯০ জন নারী চিকিৎসক— যা বৈষম্যের অভিযোগকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়— বরং স্বাস্থ্য খাতে নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
যোগ্যতা সত্ত্বেও শূন্য পদ, পদোন্নতি নেই
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, সারা দেশে রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকের ১৭টি পদ শূন্য রয়েছে। একইভাবে মেডিকেল অনকোলজি ও অন্যান্য বিশেষায়িত বিষয়ে উপযুক্ত চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। অথচ গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘ফিট লিস্ট’-এ দেখা গেছে, চাকরি স্থায়ীকরণ, সিনিয়র স্কেল ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক পদোন্নতির জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য।
সুপারনিউমারারি পদ: নীতি ছিল, প্রয়োগে বৈষম্য
যোগ্য চিকিৎসকরা যেন শূন্য পদের অজুহাতে বঞ্চিত না হন—এই যুক্তিতে সরকার সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেয়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়দুর রহমান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জানান, প্রায় ৭ হাজার ৫০০ সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করা হবে। নীতিগতভাবে এখানে কোনো নির্দিষ্ট বিসিএস সীমা ছিল না। মার্চে স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও আশ্বস্ত করেন— পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হলেই পদোন্নতি পাবেন চিকিৎসকরা, বিসিএস নির্বিশেষে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সুপারনিউমারারি পদে শুধু ৩৩ বিসিএস পর্যন্ত চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, আর ৩৪ ও পরবর্তী বিসিএসের যোগ্য চিকিৎসকদের বাদ দেওয়া হচ্ছে— যার কোনো লিখিত ব্যাখ্যা নেই।
![]()
আইনে পদোন্নতির মানদণ্ড
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস অনুযায়ী, পদোন্নতির একমাত্র বৈধ মানদণ্ড হলো— জ্যেষ্ঠতা; যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা; বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), ফিডার পোস্টে নির্ধারিত সময় পূরণ এবং সুপারিশকারী বোর্ড (এসএসবি/ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশন কমিটি)।
আইন স্পষ্ট করে বলছে, কারণ দর্শানো ছাড়া কাউকে পদোন্নতি থেকে বাদ দেওয়া বেআইনি এবং এমন সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনায় বাতিলযোগ্য। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনগুলোতে বাদ পড়াদের ক্ষেত্রে কোনো কারণ, নোট, আপিল বা রিভিউয়ের আইনি ভিত্তি উল্লেখ নেই।
সংখ্যায় স্পষ্ট বৈষম্য
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়— গাইনিতে সৃজিত সুপারনিউমারারি পদ ৯২০টি, পদোন্নতি পেয়েছেন ৫৯৯ জন। এখনো শূন্য রয়ে গেছে ৩২১টি, কার্ডিওলজিতে ২৩৩টির মধ্যে ১৫৭টি পূরণ, পেডিয়াট্রিকসে ৩৯২টির মধ্যে ২৭৯টি, সার্জারিতে ২৫৮টির মধ্যে ১৬৫টি পদ। অথচ এসব বিষয়ের ফিট লিস্টে থাকা যোগ্য চিকিৎসকদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তারপরও অজ্ঞাত কারণে ৩৪ ও পরবর্তী বিসিএসের চিকিৎসকদের বাদ দেওয়ায় প্রায় দেড় হাজার পদ ফাঁকা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আগামী বছরের জুনের মধ্যে পূরণ না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে।
পদোন্নতি বঞ্চনার চিত্র
গত তিন মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাপক, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে প্রায় ১ হাজার ৪০০ চিকিৎসককে পদোন্নতি দিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ৫টি প্রজ্ঞাপনে মোট ৮৭৯ জন চিকিৎসককে কোনো কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে— গত ১৭ জুলাই ১৩ বিষয়ে ২১৮ জন, ২৯ জুলাই ২৫ বিষয়ে ২১৭ জন, ১ সেপ্টেম্বর ৯ বিষয়ে ১৬৩ জন, ২ সেপ্টেম্বর ২৪ বিষয়ে ৫৬ জন এবং ২৩ অক্টোবর এক বিষয়ে ২৮৫ জন (সবাই নারী চিকিৎসক)। প্রজ্ঞাপনগুলোতে বাদ দেওয়ার কোনো কারণ, আপিলের সুযোগ বা নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা নেই; যা প্রশাসনিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত হস্তক্ষেপ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়মমাফিক পদোন্নতির সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি আদেশের আগে ছয় সদস্যের একটি চিকিৎসক প্রতিনিধি দল তালিকায় হস্তক্ষেপ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সুপারিশে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, আর অন্যদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতিতেই হয়েছে বলে দাবি করছেন তারা।
‘প্রমার্জনা’ দিয়ে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন
অভিযোগ আছে, মাত্র দুই বছর পাঁচ মাসের ব্যবধানে একই চিকিৎসককে একাধিক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে—যা বিধিমালার পরিপন্থী। কোথাও আপত্তির আশঙ্কা থাকলে আদেশে ‘প্রমার্জনা পূর্বক’ শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু গাইনির দুটি আদেশ বিশ্লেষণ করেই পাওয়া গেছে, একই ব্যক্তি দুইবার প্রমার্জনা পেয়েছেন।
আস্থার সংকট, চিকিৎসকদের লড়াই
পদোন্নতিবঞ্চিত চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের প্রশ্ন— যেখানে গত ১৫ বছর ধরে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও মেধাই ছিল একমাত্র মানদণ্ড, সেখানে হঠাৎ করে কেন দ্বৈত নীতি প্রয়োগ হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এখন প্রশ্ন একটাই— যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক নীতি কি আদৌ মানা হচ্ছে, নাকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বেচ্ছাচারিতার পথে হাঁটছে?
বিষয়: ##চিকিৎসক #পদোন্নতি #অনিয়ম ##প্রশ্নবিদ্ধ #স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়





ঢাকা হবে ক্লিন ও গ্রিন সিটি: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৯ জন জয়ী, আজ গেজেট প্রকাশ করবে ইসি
দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি বাতিলে সংসদে আলোচনার প্রস্তাব রুমিন ফারহানার
ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবার
জাল নোটের প্রচলন রোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: সংসদে অর্থমন্ত্রী
সংসদে অভিযোগ: নতুন ব্যাংক নোটে ত্রুটি, জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়ছে
সাংবাদিকরা বাঁচলে দেশের রাজনীতি বাঁচবে: দুলু
রাজাকার ইস্যুতে সংসদে ঝড় তুললেন মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান
হামের উপসর্গে একদিনে ১১ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ছাড়াল ২শ’
’মত প্রকাশের কারণে ধরে আনা হচ্ছে, মত-দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই’ 
