শনিবার ● ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » কলাম » আগামী প্রজন্মের চা শ্রমিকদের উন্নত জীবনমান কোথায়!
আগামী প্রজন্মের চা শ্রমিকদের উন্নত জীবনমান কোথায়!

রাহাতুল আশেকীন
আগামী প্রজন্মের চা শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী এবং সামাজিকভাবে ক্ষমতায়িত করাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। যেখানে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি এবং শিক্ষা উপবৃত্তি। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। এর কারন খুঁজতে গেলো প্রথমেই আসে যৎসামান্য বেতনের বিষয়টি। এই অপর্যাপ্ত বিষয়াদি পর্যাপ্ত করতে কিছু প্রকল্প সামনে আসতে পারে:
আবাসন: স্বাস্থ্যসম্মত এবং নিরাপদ আবাসনের সুব্যবস্থা করা, যা এখনও অনেক বাগানে অপর্যাপ্ত।
স্বাস্থ্যসেবা: বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করা।
বিকল্প আয়ের উৎস: চা শ্রমিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া, যেমন কুটির শিল্প, পশুপালন ইত্যাদি।
শিক্ষা: শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চিতকরণ। এই ধরনের প্রকল্পগুলো চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
চা শ্রমিকদের পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা প্রকল্পগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, তাদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত স্কুল তৈরি করা, বিনামূল্যে বই এবং অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা। এছাড়াও, উচ্চশিক্ষার জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করলে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
চা শ্রমিকদের পরিবারের জীবনমান উন্নত করতে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তারা নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা তাদের আয়ের উৎসকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। যেমন, দর্জির কাজ, হস্তশিল্প, পোল্ট্রি বা মৎস্য চাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা নিজস্ব কোন কাজ শুরু করতে পারে। এতে তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়ে এবং পুরো পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
চা শ্রমিকদের পরিবারের জন্য আয়মূলক কাজের প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
দর্জির কাজ: পোশাক তৈরি এবং সেলাইয়ের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
হস্তশিল্প: স্থানীয় উপকরণ দিয়ে বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরি এবং বাজারজাতকরণ।
পোল্ট্রি পালন: মুরগি, হাঁস ইত্যাদি পালন করে আয় বৃদ্ধি।
মৎস্য চাষ: পুকুরে মাছ চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা।
কম্পিউটার প্রশিক্ষণ: মৌলিক কম্পিউটার জ্ঞান এবং ইন্টারনেট ব্যবহার
ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা: ছোটখাটো ব্যবসা শুরু এবং পরিচালনার কৌশল।
জব প্লেসমেন্ট সেন্টারগুলো চা শ্রমিকদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে তাদের দক্ষতা অনুযায়ী দেশে এবং বিদেশে চাকরির সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব।
চা শ্রমিকদের বেতন কাঠামো যেহেতু এখনো অনেক সীমাবদ্ধ, তাই তাদের পরিবারের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা ছাড়া জীবনমান উন্নয়ন করা কঠিন।
উল্লিখিত বিষয়গুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং বিশেষ করে দক্ষতা উন্নয়ন ও জব প্লেসমেন্ট নিয়ে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দক্ষতা উন্নয়ন ভিত্তিক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব
চা বাগানগুলো সাধারণত মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, ফলে শ্রমিক পরিবারের তরুণ প্রজন্ম বাইরের সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারে না। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ তাদের শুধু চা পাতার ওপর নির্ভরশীলতা কমায় না, বরং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
প্রশিক্ষণের একটি বর্ধিত তালিকা:
নার্সিং ও কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ: বর্তমানে দেশে এবং বিদেশে নার্স ও বয়স্ক সেবা প্রদানকারীদের বিশাল চাহিদা রয়েছে। চা শ্রমিকদের কন্যারা এই প্রশিক্ষণ নিলে খুব দ্রুত কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে।
ড্রাইভিং ও অটোমোবাইল মেকানিক: বাগানের ছেলেদের জন্য এটি একটি চমৎকার সুযোগ। লাইসেন্সসহ ড্রাইভিং শিখলে তারা শহরের ট্রান্সপোর্ট সেক্টরে কাজ করতে পারে।
ইলেকট্রিক্যাল ও মোবাইল সার্ভিসিং: ছোটখাটো মেরামতের কাজ শিখে তারা বাগান এলাকাতেই দোকান দিতে পারে।
বিউটিফিকেশন ও হেয়ার ড্রেসিং: নারীদের জন্য এটি একটি লাভজনক পেশা হতে পারে।
অর্গানিক ফার্মিং ও ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার): বাগানের ভেতর পরিত্যক্ত জায়গায় সার তৈরি করে তারা বাগানের মালিকপক্ষের কাছেই তা বিক্রি করতে পারে।
২. জব প্লেসমেন্ট সেন্টারের ভূমিকা ও কর্মপদ্ধতি চা শ্রমিকদের পরিবারের জন্য একটি বিশেষায়িত ‘জব প্লেসমেন্ট সেন্টার’ বা ‘ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেল’ থাকা জরুরি।
তথ্য কেন্দ্র: সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবরগুলো বাগান পর্যন্ত পৌঁছানো।
নেটওয়ার্কিং: বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি (যেমন: গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সার্ভিস সেক্টর) এর সাথে বাগানের শিক্ষিত তরুণদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া।
সফট স্কিল ট্রেনিং: ইন্টারভিউ দেওয়ার কৌশল, যোগাযোগ দক্ষতা এবং জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করতে সহায়তা করা।
৩. বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসন প্রক্রিয়া চা শ্রমিকদের পরিবার বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো উচ্চ খরচ এবং দালালদের দৌরাত্ম্য।
নিরাপদ অভিবাসন: সরকারি সংস্থা এর মাধ্যমে নামমাত্র খরচে বিদেশে যাওয়ার সুযোগগুলো শ্রমিকদের জানানো।
ভাষা শিক্ষা: জাপান, কোরিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা শিক্ষা কোর্স বাগান এলাকায় চালু করা।
কারিগরি সার্টিফিকেট: বিদেশে যাওয়ার জন্য স্বীকৃত কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট সংগ্রহে সহায়তা করা।
প্রবাসী ঋণ: বিনা জামানতে বা স্বল্প সুদে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়া যাতে তারা টাকার অভাবে সুযোগ হারা না হয়।
৪. জীবনমান উন্নয়নে বাড়তি প্রস্তাবনা:
ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং ল্যাব: বাগানের তরুণদের জন্য ছোট পরিসরে ডিজিটাল ল্যাব করে দিলে তারা গ্রাফিক ডিজাইন বা ডেটা এন্ট্রির কাজ করে বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত হতে পারবে।
সমবায় সমিতি গঠন: শ্রমিক পরিবারের নারীদের নিয়ে ছোট ছোট সমবায় সমিতি করে তাদের সঞ্চয় এবং ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় আনা।
স্বাস্থ্য বীমা: সামান্য প্রিমিয়ামে শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করা, যাতে বড় কোনো অসুস্থতায় তাদের সর্বস্বান্ত হতে না হয়।
এই সুচিন্তিত পরিকল্পনাগুলো যদি সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে (সরকারি ও বেসরকারি এনজিওর উদ্যোগে) বাস্তবায়ন করা যায়, তবে চা শ্রমিকদের পরবর্তী প্রজন্ম বাগান থেকে বেরিয়ে এসে দেশের মূলধারার অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, রিভাইভাল টি





সীমানা পুনর্বিন্যাস: আদালত বনাম ইসি
নির্বাচনে ক্রাউড ফান্ডিং: সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও ইসির করণীয় 
