রবিবার ● ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনে আবারও আসছে গণভোট!
সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনে আবারও আসছে গণভোট!
![]()
শায়লা শবনম
সংবিধানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনা হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আবারও গণভোট হতে পারে। সংবিধানের প্রস্তাবনা ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় এসব সংশোধনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে গণভোটের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর ভাষ্য, সংসদে সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর যেসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক, সেগুলো রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটে যাবে।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির তৃতীয় মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠন ও বিভিন্ন সাংবাদিক ফোরামের প্রতিনিধিরা সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতামত দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য জোর প্রচেষ্টা চলছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংবিধান সংশোধনের বিল প্রস্তুত করবে। আগামী বছরের প্রথম অধিবেশন অর্থাৎ জানুয়ারির অধিবেশনে বিলটি সংসদে উত্থাপনের আশা করছে কমিটি। এরপর সংসদে আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব ও বিরোধিতার বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে বিল পাসের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
১৪২ অনুচ্ছেদ ও সাংবিধানিক গণভোট
গণভোটের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে আগে সাংবিধানিক গণভোটের বিধান ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে করা মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোট-সংক্রান্ত বিধান পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেয়। রায়ের প্রকাশিত সারাংশে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের বিধান বাতিলের অংশটি বাতিল করে আগের বিধান পুনর্বহাল করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে পাস হওয়ার পর যেসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলো রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটে পাঠানো হবে। গণভোটে সংশোধনের পক্ষে জনসমর্থন পাওয়া গেলে পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের সব ধরনের সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট প্রয়োজন হবে—এমন নয়। তবে যেসব মৌলিক বিধানে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে গণভোটের প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে সংসদীয় অনুমোদনের পর জনগণের মতামত নেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
![]()
কী কী থাকবে গণভোটের আওতায়?
বিশেষ কমিটির আলোচনায় সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২-এ পরিবর্তনের বিষয় উঠে এসেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে এসব অনুচ্ছেদে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কমিটির আলোচনা, বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাব এবং প্রতিবেদন তৈরির পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো সংসদ যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধান সহজে পরিবর্তন বা বাতিল করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গণভোট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এসেছে।
তার ভাষ্য, বিএনপির পক্ষ থেকেও এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ-সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন করতে চাইলে জনগণের অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এখানে গণভোটের আওতায় আসতে পারে—এমন বিষয় হিসেবে আলোচনায় রয়েছে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা তৈরির প্রস্তাব। তবে এগুলোর চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করবে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন এবং পরবর্তী আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ওপর।
ফিরছে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা’
সংবিধান সংশোধনের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নই কমিটির প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে। তিনি জানান, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের সময় এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জুলাই সনদকে অগ্রাধিকার
সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় জুলাই জাতীয় সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশেষ কমিটি। জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত এ সনদে ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট স্বাক্ষর করে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেছিল। এ সনদে থাকা সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
বিরোধী দলকে অন্তর্ভুক্তির আহ্বান
বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠকে সম্পাদক ও সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংশোধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার বারবার আহ্বান জানিয়েছে। তারা যোগ দিলে তাদের মতামত ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের মধ্যে পক্ষ থাকুক, বিভক্তি না থাকুক।’ বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নিলে তাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিষয়গুলোও কমিটির আলোচনায় ধারণ করা সম্ভব হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা কমিটির নেই; তারা শুধু আহ্বান জানাতে ও আশা করতে পারে বলেও জানান তিনি।
![]()
সম্পাদক-সাংবাদিকদের মতামত
রোববারের বৈঠকে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন সাংবাদিক ফোরামের নেতারা সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও তফসিল নিয়ে মতামত দেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত না রাখা এবং সরকারি নিয়োগে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়।
এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনো সংসদ সহজে তা পরিবর্তন বা বাতিল করতে না পারে, সে জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অনেকেই লিখিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বৈঠকে পাওয়া মতামত ও লিখিত প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন, জানুয়ারিতে বিল
বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক জানান, ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য জোর চেষ্টা চলছে। এরপর ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংবিধান সংশোধনের বিল প্রস্তুত করবে। আগামী বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের আশা করছে কমিটি। সংসদে বিলের ওপর আলোচনা, সংশোধনী ও বিরোধিতার বিষয় নিষ্পত্তির পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তা পাস হবে।
এরপর যেসব সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা থাকবে, সেগুলো রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে জনগণের ভোটে যাবে। ফলে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন, সংসদে বিল উত্থাপন ও অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গণভোট—এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে।
এখানে “কী কী থাকবে গণভোটের আওতায়” অংশটি ইচ্ছাকৃতভাবে সতর্ক ভাষায় রাখা হয়েছে—কারণ ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আলোচিত/প্রস্তাবিত বিষয়, সবগুলোর চূড়ান্ত সংশোধনী এখনো প্রকাশিত হয়নি।
উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত এ সনদে ২৬টি দল ও জোট স্বাক্ষর করে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করে এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সনদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়। পরে ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব থাকলেও তারা এখনো প্রতিনিধিদের নাম দেয়নি।
বিষয়: #সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনে আবারও আসছে গণভোট!





জামিনের ১ মাস পর সাংবাদিক আজহার আলীর মৃত্যু
বিশ্বমানের ‘বসুন্ধরা সুপারগল্ফের’ যাত্রা শুরু
জানুয়ারিতে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চাই: ইসি আনোয়ারুল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের 
