শিরোনাম:
ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
Swadeshvumi
শনিবার ● ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » ড্রাফট » জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তারেক রহমানের ভাষণ
প্রচ্ছদ » ড্রাফট » জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তারেক রহমানের ভাষণ
৭ বার পঠিত
শনিবার ● ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তারেক রহমানের ভাষণ

  • সংলাপ-কূটনীতিতে সংঘাত সমাধানের আহ্বান
  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের কার্যকর সমর্থন চান
  • জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে জোর

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

বিশ্বের চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকট নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসন, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ভাষণের শুরুতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’ হয়েছে—এটি তাঁর বক্তব্যের ভাষ্য। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

জাতিসংঘে তাঁর ভাষণে পারিবারিক স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনিও দেশের জনগণের স্বার্থ এবং শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশার কথা বলছেন।

সংঘাত সমাধানে কূটনীতির আহ্বান

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

তিনি বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদা।

পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ নয় বছর ধরে তাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়াকেই সংকটের সমাধান হিসেবে উল্লেখ করে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন চান তিনি।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়নের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে।

তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।

‘৩-আর’ কৌশলে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কথা

দেশ পুনর্গঠনে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’—এই তিনটি ‘আর’ বা ৩-আর কৌশলের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথাও জানান তিনি।

নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির কার্ড সমন্বয় করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির প্রসঙ্গে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষায়, আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

জাতিসংঘের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যয়

অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা তুলে ধরে শান্তি, নিরাপত্তা ও বহুপক্ষীয়তার প্রতি দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

ভাষণের শেষ দিকে তিনি বলেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন—‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’।

গুতেরেসের সঙ্গে তারেকের বৈঠক

এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সেক্রেটারিয়েট ভবনের ২৭তম তলায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সহযোগিতা, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং জাতিসংঘের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান নিয়েও আলোচনা হয়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে জাতিসংঘের সহযোগিতা ও সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বহুপক্ষীয়তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। বৈঠকে অভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ।






আর্কাইভ