শিরোনাম:
ঢাকা, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২
Swadeshvumi
রবিবার ● ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » নির্বাচনে অপতথ্য মোকাবিলায় ইসির তৎপরতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ কেন?
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » নির্বাচনে অপতথ্য মোকাবিলায় ইসির তৎপরতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ কেন?
২ বার পঠিত
রবিবার ● ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

নির্বাচনে অপতথ্য মোকাবিলায় ইসির তৎপরতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ কেন?

---

শায়লা শবনম

একদিকে ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার আর ভোটকেন্দ্রের প্রস্তুতি, অন্যদিকে চলছে নীরব কিন্তু গভীর এক যুদ্ধ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সাইবার স্পেসে যে ধরনের অপতথ্য ও অপপ্রচারের ঢল নেমেছে, তা শুধু বিভ্রান্তি নয়, সরাসরি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ভুয়া ভিডিও, বিকৃত সংবাদপাঠকের ক্লিপ, নকল ফটোকার্ড এবং এআইচালিত বট বাহিনীর মাধ্যমে ছড়ানো গুজব ভোটারদের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) অপতথ্য মোকাবিলায় কী করছে—সে প্রশ্নটি এখন কেবল রাজনৈতিক দল বা বিশ্লেষকদের নয়, সাধারণ ভোটারেরও।

ডিজিটাল অপপ্রচারের নতুন রূপ, পুরোনো দুর্বলতা

এবারের নির্বাচনে অপতথ্যের ধরন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ভিডিওতে পরিচিত মুখ ও কণ্ঠ ব্যবহার করে ছড়ানো হচ্ছে ভুয়া বক্তব্য। মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো বসিয়ে তৈরি করা ফটোকার্ডে ছড়ানো হচ্ছে মিথ্যা দাবি। বট বাহিনী এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে দিচ্ছে এমনভাবে, যাতে সেগুলো ‘জনমত’ বলে মনে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অপপ্রচারের বড় শক্তি হলো গতি। একটি মিথ্যা ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, অথচ তা খণ্ডনের প্রক্রিয়া অনেক ধীর।

ইসির উদ্যোগ: মনিটরিং সেল ও অ্যাপ

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন অপতথ্য ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা ও অপতথ্য মনিটরিং সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই সেলে কাজ করছেন ৮২ জন কর্মকর্তা। পাশাপাশি ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং অ্যাপ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি।

ইসি সূত্র জানায়, এই অ্যাপে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের যেকোনো অনিয়ম, সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার তথ্য, ছবি ও ভিডিও পাঠাতে পারবেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে সেই তথ্য সরাসরি ইসির কেন্দ্রীয় সেলে পৌঁছাবে, যেখানে থেকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগগুলো কি অনলাইনে ছড়ানো ডিপফেক, বট বাহিনী ও এআইচালিত অপপ্রচার ঠেকাতে পারবে?

ইসির অবস্থান: আইন প্রয়োগের আশ্বাস

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “অপতথ্য ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আমরা বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করবো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ প্রচলিত আইনে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধা দিলে শাস্তির সুযোগ রয়েছে।”

ইসি জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিন গুজব ছড়ানো ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়?

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ অনুযায়ী নির্বাচনকালীন অপতথ্য ও অপপ্রচারকে সরাসরি দুর্নীতিমূলক আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিল, নির্বাচন বাতিল, এমনকি কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধানও রয়েছে। নতুন সংশোধনীতে এআই ব্যবহার করে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারও দণ্ডনীয় অপরাধ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনলাইনে অপতথ্য ছড়ানোর ঘটনায় এখন পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুবই সীমিত। ফলে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞের সতর্কতা: সময় খুব কম

সাইবার স্পেশালিস্ট আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন,  “ডিপফেক ও গুজব ছড়ানো যেসব অ্যাকাউন্ট ও প্ল্যাটফর্ম থেকে হচ্ছে, সেগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। নির্বাচনের ঠিক আগে এআই ব্যবহার করে অপপ্রচার আরও বাড়বে। নিজস্ব শক্তিশালী ডিজিটাল রেসপন্স টিম ছাড়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এই অপপ্রচার থামানো সম্ভব হবে না।”

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে প্রায় ৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বড় অংশই তথ্য যাচাই না করেই বিশ্বাস করে। এই বাস্তবতায় অপতথ্য নির্বাচনী পরিবেশকে মুহূর্তেই বিষিয়ে তুলতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং অ্যাপ ও বিশেষ সেল ইসির একটি অগ্রগতি—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে বট বাহিনী ও এআইচালিত অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। দ্রুত শনাক্তকরণ, রিয়েল-টাইম ফ্যাক্টচেকিং এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এই লড়াইয়ে জেতা কঠিন। এবারের সংসদ নির্বাচন ও গণভোট তাই শুধু ব্যালটের পরীক্ষা নয়—এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল গণতন্ত্র কতটা সুরক্ষিত, তারও বড় পরীক্ষা।






আর্কাইভ