শিরোনাম:
ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
Swadeshvumi
বৃহস্পতিবার ● ১৪ মে ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » মায়ের কোলে চির ঘুমে ‘মঞ্চসারথি’
প্রচ্ছদ » জাতীয় » মায়ের কোলে চির ঘুমে ‘মঞ্চসারথি’
১১১ বার পঠিত
বৃহস্পতিবার ● ১৪ মে ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

মায়ের কোলে চির ঘুমে ‘মঞ্চসারথি’

কীর্তিমানের মৃত্যু নাই

---


নিজস্ব প্রতিবেদক

শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছেই ফিরে গেলেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, মঞ্চের আলো-ছায়া আর করতালির ভুবন থেকে বিদায় নিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মায়ের কবরের পাশে। যেন মৃত্যুর মধ্য দিয়েও পূর্ণ হলো এক গভীর মানবিক বৃত্ত—মায়ের কোলে ফিরে যাওয়া সন্তানের অনন্ত আশ্রয়। এভাবেই বিদায় নিলেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, যিনি সংস্কৃতি অঙ্গনে ‘মঞ্চসারথি’ নামেই অধিক পরিচিত।

টানা দশ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয় একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত এই নাট্যজনকে। পরিবারের সিদ্ধান্তে মায়ের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয় তাকে। এই দৃশ্য যেন তার জীবনদর্শনেরই প্রতীক—যে মানুষটি সারাজীবন সংস্কৃতিকে মানুষের আত্মার আশ্রয় হিসেবে দেখেছেন, শেষ আশ্রয়ও নিলেন মায়ের সান্নিধ্যে।

আতাউর রহমানের মৃত্যু কেবল একজন নাট্যব্যক্তিত্বের বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাত্তোর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সংস্কৃতিকে কেবল বিনোদন নয়, বরং জাতির চেতনা নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে গড়ে ওঠা নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়–এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি মঞ্চনাটককে নাগরিক জীবনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

বাংলাদেশে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত মঞ্চনাটক প্রদর্শনের যে সংস্কৃতি, তার পথিকৃৎও ছিল এই দল। সেই অভিযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন আতাউর রহমান। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ দিয়ে মঞ্চনির্দেশক হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরবর্তী সময়ে তিনি উপহার দেন ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘রক্ত করবী’, ‘ঈর্ষা’, ‘এখন দুঃসময়’ কিংবা ‘অপেক্ষমাণ’-এর মতো প্রযোজনা। তার নির্দেশনায় নাটক হয়ে উঠেছিল সময়ের ভাষ্য, সমাজের আত্মজিজ্ঞাসা।

তার মৃত্যুতে নাট্যাঙ্গনের মানুষজনের ভিড় জমেছিল মগবাজারের বাসভবনের সামনে। প্রথম জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, জাহিদ হাসান, গাজী রাকায়েতসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু মানুষ। শহীদ মিনারেও ছিল অগণিত মানুষের ঢল। ফুলেল শ্রদ্ধা জানান রামেন্দু মজুমদার, তারিক আনাম খান, সারা যাকের, লাকী ইনামসহ অনেকে। এই উপস্থিতি প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না—ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

নাট্যচর্চার পাশাপাশি শিক্ষকতা ও লেখালেখিতেও সক্রিয় ছিলেন আতাউর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়–এ খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। তার লেখা ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলে’ কিংবা ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’ শুধু নাট্যতত্ত্ব নয়, সাংস্কৃতিক চিন্তারও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

সংগঠক হিসেবেও তার অবদান ছিল অসামান্য। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট-বাংলাদেশ কেন্দ্র–এর নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার হাত ধরেই বহু তরুণ নাট্যকর্মী মঞ্চে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন।

আজ যখন বাণিজ্যিক বিনোদনের চাপে মঞ্চনাটক টিকে থাকার লড়াই করছে, তখন আতাউর রহমানের জীবন ও কর্ম নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—সংস্কৃতি কেবল শিল্প নয়, এটি সমাজ নির্মাণের শক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তার সাহিত্য, নাটক, গান ও শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে। তাই তার প্রস্থান শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক দর্শনের বিদায়ও।

তবু কীর্তিমানদের মৃত্যু হয় না। তারা থেকে যান তাদের সৃষ্টি, দর্শন ও উত্তরসূরিদের ভেতরে। বনানীর নিভৃত কবরস্থানে মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আতাউর রহমান হয়তো আর মঞ্চে ফিরবেন না, কিন্তু বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে তার পদচিহ্ন বহুদিন পথ দেখাবে। সেই অর্থেই, ‘মঞ্চসারথি’র মৃত্যু নেই—তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলা নাটকের প্রতিটি আলোকিত মঞ্চে, প্রতিটি সংলাপে, প্রতিটি নতুন নাট্যকর্মীর স্বপ্নে।



বিষয়: #



আর্কাইভ