শিরোনাম:
ঢাকা, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২
Swadeshvumi
শুক্রবার ● ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » প্রধান সংবাদ » বিশ্ব অর্থনীতিতে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাফল্য, দক্ষ জনশক্তি গড়ার গুরুত্বপূর্ণ পাঠ
প্রচ্ছদ » প্রধান সংবাদ » বিশ্ব অর্থনীতিতে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাফল্য, দক্ষ জনশক্তি গড়ার গুরুত্বপূর্ণ পাঠ
১৫ বার পঠিত
শুক্রবার ● ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

বিশ্ব অর্থনীতিতে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাফল্য, দক্ষ জনশক্তি গড়ার গুরুত্বপূর্ণ পাঠ

---

রাহাতুল আশেকীন

বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে গত অর্ধশতকে এশিয়ার উত্থান সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও চীন— এই দুই দেশের সাফল্য উন্নয়ন অর্থনীতির পাঠ্যবই বদলে দিয়েছে। একটি দেশ ভৌগোলিক আয়তনে ক্ষুদ্র, প্রাকৃতিক সম্পদহীন; অন্যটি জনসংখ্যায় বিশ্বের বৃহত্তম। তবু উভয়ের অভিন্ন শক্তি, দক্ষ জনশক্তি। বাংলাদেশের জন্য এখানেই রয়েছে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা।

সিঙ্গাপুর: দক্ষতা-কেন্দ্রিক উচ্চ আয়ের অর্থনীতি

১৯৬৫ সালে স্বাধীনতার সময় সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র প্রায় ৫০০ মার্কিন ডলার। আজ তা ৭০ হাজার ডলারের বেশি। প্রাকৃতিক সম্পদহীন দেশটি মানবসম্পদকে কৌশলগতভাবে বিনিয়োগে পরিণত করেছে।

সিঙ্গাপুরের Progressive Wage Model (PWM) বেতন কাঠামোকে সরাসরি দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা লিফট অপারেটর—যে-ই হোন না কেন, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন অর্জন করলে আইন অনুযায়ী তার বেতন বাড়াতে হয়। অর্থাৎ “সময়” নয়, “দক্ষতা” বেতনের ভিত্তি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে SkillsFuture উদ্যোগ। ২০১৫ সালে চালু হওয়া এই জাতীয় কর্মসূচির আওতায় ২৫ বছর বয়সোর্ধ্ব প্রতিটি নাগরিককে প্রশিক্ষণের জন্য ক্রেডিট দেওয়া হয়। সরকার ভর্তুকিযুক্ত কোর্স, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং শিল্প-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে। ডিজিটাল লিটারেসি, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, এআই, রোবোটিক্স, বায়োটেকনোলজি—চাহিদাভিত্তিক কোর্সের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর শ্রমবাজারকে ভবিষ্যৎমুখী করেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো Workfare Skills Support (WSS), যা নিম্ন-আয়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণে নগদ প্রণোদনা দেয়। এর ফলে “Learn and Earn” সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে—শেখা মানেই আয় বৃদ্ধি।

ফলাফল? সিঙ্গাপুর আজ বৈশ্বিক ফিন্যান্স, লজিস্টিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও বায়োমেডিকেল খাতে শীর্ষ অবস্থানে। শ্রম উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ সূচকে দেশটি ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ দশে অবস্থান করছে।

চীন: শিল্প-শিক্ষা সংযোগের গণবিপ্লব

১৯৭৮ সালে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির পর চীন কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প-প্রযুক্তিনির্ভর শক্তিতে রূপ নেয়। বর্তমানে চীন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানুফ্যাকচারিং অর্থনীতি—বিশ্ব শিল্প উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ একাই সরবরাহ করে।

চীনের মূল কৌশল ছিল “Industrial-Educational Integration”—শিল্প ও শিক্ষার একীভূতকরণ। সারা দেশে হাজার হাজার ভোকেশনাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ‘থিউরি + প্র্যাকটিক্যাল’ দ্বৈত পদ্ধতিতে অর্ধেক সময় ক্লাসরুমে এবং অর্ধেক সময় কারখানায় ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করে।

২০২৬ সালে চালু হওয়া “Eight-Level Worker” মডেলে দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মীদের আটটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। উচ্চতর সার্টিফিকেট মানেই দ্রুত পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি। এতে দক্ষতা অর্জনকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

চীন উচ্চপ্রযুক্তি খাতে “New Quality Productive Forces” ধারণা সামনে এনেছে। এআই, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবোটিক্স, ড্রোন প্রযুক্তি, ইলেকট্রিক ভেহিকল, গ্রিন এনার্জি ও স্মার্ট লজিস্টিকস—এসব খাতে ব্যাপক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও সরাসরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় যুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, Huawei ও JD.com শিল্পখাতের প্রয়োজন অনুযায়ী কারিকুলাম উন্নয়নে অংশ নেয়। ফলে স্নাতক হওয়ার দিন থেকেই শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত থাকে।

ফলাফল হিসেবে চীন আজ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রবিন্দু এবং উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনে দ্রুত অগ্রসরমান।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: জনসংখ্যা নাকি জনসম্পদ?

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মক্ষম বয়সের। কিন্তু শ্রমশক্তির বড় অংশ অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। প্রবাসী আয়ের বড় অংশ আসে স্বল্পদক্ষ শ্রম থেকে। শিল্পখাতে প্রযুক্তি রূপান্তর ঘটলেও দক্ষতার ঘাটতি উৎপাদনশীলতাকে সীমিত রাখছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে টিভেট (Technical and Vocational Education and Training) খাতে অংশগ্রহণ হার তুলনামূলক কম। শিল্পমালিকদের অভিযোগ—কারিগরি শিক্ষার কারিকুলাম বাজারের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখানেই সিঙ্গাপুর ও চীনের মডেল গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য ৫ দফা রোডম্যাপ

১. Skill-to-Wage Integration:

দক্ষতার সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করতে হবে। এতে দক্ষতা অর্জনের আর্থিক প্রণোদনা তৈরি হবে।

২. শিল্প-ভিত্তিক কারিকুলাম:

বিজিএমইএ, বেসিসসহ খাতভিত্তিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন।

৩. দ্বৈত শিক্ষা পদ্ধতি:

কলেজে থিউরি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ।

৪. ডিজিটাল ভোকেশনাল প্ল্যাটফর্ম:

গ্রাম পর্যায়ে অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষণ।

৫. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ:

সরকার অবকাঠামো দেবে, বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দেবে।

সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে দক্ষতা ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব। চীন দেখিয়েছে জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া যায়। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি রূপান্তরের যুগে টেকসই অগ্রগতির একমাত্র ভিত্তি দক্ষ মানবসম্পদ।

যদি দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করা যায়, বেতন কাঠামোকে দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা যায় এবং শিল্প-শিক্ষার সেতুবন্ধন নিশ্চিত করা যায়—তবে ২০৪৫ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল কাগজে নয়, বাস্তবেও রূপ নেবে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, রিভাইভাল টি






আর্কাইভ