শিরোনাম:
ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Swadeshvumi
রবিবার ● ১১ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » মাটির চুলা ও বৈদ্যুতিক চুলা কেনার হিড়িক
প্রচ্ছদ » জাতীয় » মাটির চুলা ও বৈদ্যুতিক চুলা কেনার হিড়িক
১৭৯ বার পঠিত
রবিবার ● ১১ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

মাটির চুলা ও বৈদ্যুতিক চুলা কেনার হিড়িক

 এলপি গ্যাসের সংকট চরমে 

---

শায়লা শবনম

‘সকাল থেকে তিনবার চুলা জ্বালাতে গিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছি। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে না পাঠাতেই দুপুর গড়িয়ে যায়। কখন গ্যাস আসবে—সে খবর কারও কাছেই নেই।’ — কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার গৃহিণী মৌটুসী আক্তার। গ্যাসের অভাবে তার সংসারের দৈনন্দিন ছন্দ পুরোপুরি ভেঙে গেছে। বাধ্য হয়ে কয়েক দিন আগে বারান্দায় একটি মাটির চুলা বসিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নাজমা বেগম একা নন— ঢাকাসহ সারা দেশে হাজারো গৃহিণীর এখন একই অবস্থা। গ্যাসের সংসকটে বাড়তি দামে বিকল্প রান্নার চুলা বা যন্ত্র (মাটির চুলা, বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন ও রাইস কুকার) কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্তরা।

দেশজুড়ে এলপি গ্যাস সংকট এখন চরমে পৌঁছেছে। দিনের পর দিন গ্যাস না থাকায় সাধারণ মানুষের রান্নাবান্না থেকে শুরু করে জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে মাটির চুলা, বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন ও রাইস কুকারের চাহিদা।

ঢাকায় রান্নাঘরে অচলাবস্থা

রাজধানীর মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, ডেমরা, শনির আখড়া— প্রায় সব এলাকাতেই একই চিত্র। কোথাও সকালবেলা গ্যাস থাকে না, কোথাও গভীর রাতে সামান্য চাপ আসে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। চাকরিজীবী পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। অনেকেই রাতে রান্না করে খাবার সংরক্ষণ করছেন। আবার কেউ কেউ বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন, যা মাসিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সারাদেশে একই সংকট

গ্যাস সংকট শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, ফেনী, বগুড়া ও খুলনাসহ বিভিন্ন শহরেও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব আরও তীব্র।

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, “আগে রাতে হলেও গ্যাস পাওয়া যেত। এখন সারাদিন চুলা জ্বলে না। মাটির চুলা কিনে নিতে হয়েছে।”

বিকল্পের খোঁজে মাটির চুলা ও ইন্ডাকশন

গ্যাস না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। গ্রামবাংলার পরিচিত মাটির চুলা এখন শহুরে জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও ফুটপাতে মাটির চুলার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও হট প্লেটের চাহিদাও বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, আগে যেখানে মাসে কয়েকটি ইন্ডাকশন বিক্রি হতো, এখন প্রতিদিনই বিক্রি হচ্ছে।

বাড়ছে দাম, বাড়ছে দুর্ভোগ

চাহিদা বাড়ার সুযোগে অনেক জায়গায় দামও বেড়েছে। মাটির চুলার দাম ২০০–৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। ইন্ডাকশন কুকার ও বৈদ্যুতিক চুলার দামও ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বাড়তি চাপ। গ্যাস না থাকায় একদিকে খাবার প্রস্তুত করতে সমস্যা, অন্যদিকে বিকল্প ব্যবস্থায় খরচ বাড়ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির চুলা ব্যবহারে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও ফুসফুসের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি আরও বিপজ্জনক। আবার বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে, যা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

কেন এই সংকট?

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস, এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতা ও পুরোনো পাইপলাইন— সব মিলিয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ সেই অনুযায়ী বাড়ানো যাচ্ছে না।

টেকসই সমাধান কোথায়?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিমের মতে, সাময়িকভাবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল করাই একমাত্র সমাধান। স্বদেশভূমিকে তিনি জানান, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে পরিকল্পিত রূপান্তর প্রয়োজন।

মানুষের অপেক্ষা স্থায়ী সমাধানের

গ্যাস সংকট এখন আর শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়; এটি জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নাজমা বেগমের মতো গৃহিণীরা আপাতত মাটির চুলা বা ইন্ডাকশনে ভরসা রাখলেও সবার প্রশ্ন একটাই এই দুর্ভোগ কত দিন চলবে? স্থায়ী সমাধান না এলে সাময়িক বিকল্পই যে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় পরিণত হবে, সে আশঙ্কাই এখন বড় হয়ে উঠছে।






আর্কাইভ