বৃহস্পতিবার ● ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » জাতীয় » স্মরণে শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতা: আজ ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস
স্মরণে শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতা: আজ ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস
![]()
শায়লা শবনম
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সাহস, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নেওয়া এই নারী বিপ্লবীর ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস আজ ২৪ সেপ্টেম্বর। ১৯৩২ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়ার পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার এড়াতে পটাশিয়াম সায়ানাইড পান করে আত্মাহুতি দেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর।
প্রীতিলতা ছিলেন বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্য সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই অভিযানের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নারীর সক্রিয় ও সশস্ত্র অংশগ্রহণের একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্তও তৈরি হয়।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তাঁর বাবা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসে হেড কেরানি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মা প্রতিভা দেবী ছিলেন গৃহিণী। ছয় সন্তানের মধ্যে প্রীতিলতা ছিলেন দ্বিতীয়।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন তিনি। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত আইএ পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় পঞ্চম এবং ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
পরে কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হয়ে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাঁর বিএ পরীক্ষার ফল প্রকাশে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরে দীর্ঘ সময় পর তাঁর সনদ ও নম্বরপত্র উদ্ধার করা হয়।
শিক্ষাজীবন শেষে চট্টগ্রামের নন্দনকানন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রীতিলতা। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং নারী বিপ্লবীদের সংগঠিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণেও যুক্ত ছিলেন।
সূর্য সেনের সান্নিধ্যে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড
মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠলে প্রীতিলতাও সেই আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৩২ সালের জুনে পটিয়ার ধলঘাটে বিপ্লবী সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে সূর্য সেনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় বলে বিপ্লবী ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। ওই সময় থেকেই তিনি আরও সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। নারী হওয়াকে কোনো বাধা হিসেবে না দেখে তিনি অস্ত্র চালনা ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন। বিপ্লবী দলের বিভিন্ন কাজে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি নারী সদস্যদেরও সংগঠিত করেন।
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ
১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। এর আগে ওই ক্লাবটি ব্রিটিশদের বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ক্লাবটির সঙ্গে ঔপনিবেশিক বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে যুক্ত ছিল ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’ ধরনের সাইনবোর্ডের কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
এই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব প্রথমে কল্পনা দত্তের ওপর দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কল্পনা দত্ত গ্রেপ্তার হওয়ায় দায়িত্ব এসে পড়ে প্রীতিলতার ওপর। এরপর তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে অভিযানের প্রস্তুতি নেন। নির্ধারিত রাতে প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ চালান। গুলি ও বোমা নিয়ে পরিচালিত ওই অভিযানের পর বিপ্লবীরা নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ফেরার পথে প্রীতিলতা গুলিবিদ্ধ হন।
সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তিনি নিজে পেছনে থাকেন। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে আন্দোলনের গোপন তথ্য প্রকাশের আশঙ্কায় আগে থেকেই সঙ্গে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড পান করেন তিনি। এভাবেই ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মাত্র ২১ বছর বয়সে আত্মাহুতি দেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত
প্রীতিলতার আত্মাহুতি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গভীর প্রতীকী ঘটনা হয়ে আছে। একজন নারী হয়েও তিনি যে সময় সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী।
তার জীবন ও আত্মত্যাগ পরবর্তী সময়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় প্রীতিলতার নাম বারবার উঠে আসে।
স্মৃতির যত্নে প্রশ্ন
প্রীতিলতার স্মৃতিবিজড়িত পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবটি বর্তমানে ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা জাদুঘর’ নামে পরিচিত হলেও এর সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভবনটির জীর্ণ দশা এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে এমনকি জাদুঘরটির ভেতরে উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ না থাকার কথাও বলা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রীতিলতার জন্মস্থান পটিয়ার ধলঘাটেও তাঁর স্মৃতি রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। সেখানে বীরকন্যা প্রীতিলতা ট্রাস্টের উদ্যোগে স্মরণ অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় এই বীরকন্যাকে। তবে শুধু আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়, তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক স্থান ও নিদর্শন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ইতিহাসসচেতন মানুষজন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে মাত্র ২১ বছরের জীবনে প্রীতিলতা যে সাহস ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ৯৪ বছর পরও তাঁর আত্মাহুতির দিনটি তাই শুধু একজন বিপ্লবীর স্মরণদিবস নয়, উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নারীর অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল স্মারক।
বিষয়: #স্মরণে শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতা: আজ ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস





জানুয়ারিতে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চাই: ইসি আনোয়ারুল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের
স্থানীয় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ ১০ দফা দাবি
আ.লীগ আমলের স্বাস্থ্য খাতে সব দুর্নীতির ঘটনা তদন্তের সুপারিশ সংসদীয় কমিটির
ইউপি নির্বাচনে বাড়ল জামানত, হলফনামায় বিদেশে সম্পদের হিসাব
ঢাকাকে মডেল সিটি ও পুরান ঢাকার পুনর্গঠনকে গুরুত্ব
নভেম্বর ইউপি ভোট নয়, পিছিয়ে যাচ্ছে ইসির রোডম্যাপ 
