শিরোনাম:
ঢাকা, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২
Swadeshvumi
সোমবার ● ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » ইসির আপিল শুনানি-নিষ্পত্তি :ভোটের মাঠে ফিরতে মরিয়া ছিলেন বাদপড়া প্রার্থীরা
প্রচ্ছদ » ইসি ও নির্বাচন » ইসির আপিল শুনানি-নিষ্পত্তি :ভোটের মাঠে ফিরতে মরিয়া ছিলেন বাদপড়া প্রার্থীরা
২৪ বার পঠিত
সোমবার ● ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
Decrease Font Size Increase Font Size Email this Article Print Friendly Version

ইসির আপিল শুনানি-নিষ্পত্তি :ভোটের মাঠে ফিরতে মরিয়া ছিলেন বাদপড়া প্রার্থীরা

# হামলা, হট্টগোল ঘটনাবহুল ৯ দিনে শুনানিতে ফিরলেন ৪ শতাধিক প্রার্থী

# আপিলেও ছিটকে পড়লেন প্রায় ২শ’ আলোচিত রাজনৈতিক নেতা

# শুনানিতে বাদপড়াদের রয়েছে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ

---

শায়লা শবনম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র ২৩ দিন বাকি। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ধাপ ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ৯ দিনব্যাপী আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি কার্যক্রম। গত ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলা এই শুনানি-নিষ্পত্তিতে একদিকে যেমন ৪ শতাধিক প্রার্থী আবারও ভোটের মাঠে ফিরেছেন, অন্যদিকে বহু পরিচিত রাজনৈতিক মুখ চূড়ান্তভাবে ছিটকে পড়েছেন। এছাড়া হামলা, হট্টগোল, উত্তেজনা, পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নয় দিনের এই শুনানি নির্বাচনী ভবনকে পরিণত করেছে এক উত্তপ্ত মঞ্চে।

আপিলে ফিরলেন ৪ শতাধিক

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবারে নির্বাচন কমিশনে মোট ৬৪৫টি আপিল জমা পড়ে। কমিশনের তথ্যমতে, এর মধ্যে চার শতাধিক প্রার্থীর আপিল মঞ্জুর হয়েছে। মূলত স্বাক্ষরসংক্রান্ত ত্রুটি, কারিগরি ভুল ও কাগজপত্রের অসংগতি থাকা প্রার্থীরা আপিলে ছাড় পেয়েছেন। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি বা তথ্য গোপনের মতো গুরুতর অভিযোগে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ইসি কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

শেষ দিনের শুনানি: বহাল মিন্টু, বাতিল সরোয়ার

আপিল শুনানির শেষ দিন ছিল সবচেয়ে নাটকীয়। ফেনী-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অভিযোগ সত্ত্বেও বহাল রাখা হয়। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়ন পরবর্তীতে বাতিল হয়। একই দিনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে।

আলোচিত প্রার্থী: কেউ ফিরলেন, কেউ বাদ

ঢাকা-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান এবং টাঙ্গাইল-৪ আসনের সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী ভোটের মাঠে ফিরে আসেন। বিপরীতে, কুমিল্লা-৪ আসনের চারবারের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল বহাল থাকায় আপাতত ওই আসনে বিএনপি প্রার্থীশূন্য। চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াত প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের প্রার্থিতাও দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে বাতিল। এছাড়া জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের মনোনয়নও বাতিলই থাকছে।

উত্তেজনা, হামলা ও রাজনৈতিক অভিযোগ

নির্বাচন ভবনে একাধিকবার হট্টগোল ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক রিটকারীকে হামলার ঘটনাও ঘটে। আইনজীবীদের বাদানুবাদ ও সমর্থকদের স্লোগানে কিছু শুনানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। শেষ দিনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, ইসির কতিপয় কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের একটি অংশ নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করছে। এছাড়া পোস্টাল ব্যালট, ভোটার স্থানান্তর ও এনআইডি তথ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তোলা হয়।

আপিল নিয়ে ইসির অবস্থান

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, আপিল শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করা হয়নি। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা সব আপিল আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংক্রান্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে যাতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।

কেন বাতিল হয় মনোনয়ন

এবার মনোনয়ন বাতিলের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণখেলাপি হওয়া, দ্বৈত নাগরিকত্ব, হলফনামায় তথ্য গোপন, দলীয় মনোনয়নপত্রে অসংগতি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটি বা স্বাক্ষরসংক্রান্ত ভুলে যাঁদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছিল, তাঁদের অধিকাংশই আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি সংক্রান্ত অভিযোগে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ইসি কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

আপিল মঞ্জুর হলে ও খারিজ হলে কী হয়

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, মনোনয়ন বাতিলের পর প্রার্থীর প্রথম ও প্রধান পথ হলো নির্বাচন কমিশনে আপিল করা। আপিল মঞ্জুর হলে প্রার্থিতা পুনর্বহাল হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার না করলে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন ভোটের ব্যালট পেপারেও প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকে। অন্যদিকে, ইসিতে আপিল খারিজ হলে প্রার্থী কার্যত নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়েন। প্রশাসনিকভাবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।

বাদপড়াদের শেষ ভরসা: উচ্চ আদালত

ইসিতে আপিল খারিজ হওয়া প্রার্থীদের জন্য শেষ পথ হলো উচ্চ আদালত। আইন অনুযায়ী তারা হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। তবে নির্বাচনি তফসিলের সীমিত সময় ও ব্যালট ছাপার প্রক্রিয়ার কারণে রায় পাওয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নজিরও আছে— ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহীউদ্দ্দীন খান আলমগীর এবং ২০১৮ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রার্থী উচ্চ আদালতের আদেশে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসি যদি এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে বা চরম অন্যায় করে থাকে—এমনটি প্রমাণ করতে না পারলে আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করেন না। আর নির্বাচনি তফসিল খুব সংক্ষিপ্ত হওয়ায় ব্যালট পেপার ছাপানোর আগে রায় পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, মনোনয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্তই মূলত চূড়ান্ত। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপ গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—শর্ত হলো, সময়ের মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ থাকতে হবে।

আপিল শুনানি শেষে এখন নজর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের দিকে। ২০ জানুয়ারি শেষ হবে প্রত্যাহারের সময়, ২১ জানুয়ারি প্রকাশ হবে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ও প্রতীক বরাদ্দ। ২২ জানুয়ারি শুরু হবে নির্বাচনি প্রচারণা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নয় দিনের আপিল কার্যক্রমই মূলত নির্ধারণ করেছে— কারা এবার ভোটের মাঠে থাকবেন, আর কারা লড়াই চালাবেন আদালতের বারান্দায়।






আর্কাইভ